,



প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র

 

সুজন মৃধা, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের অধিক ঝুঁকিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ প্রাকৃতিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান সমুদ্র সান্নিধ্য হওয়ায় এবং জলবায়ু পরির্বতনে বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রের তলদেশে পলি পড়ে পানির উচ্চতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এখানকার মানুষের জন্য আরো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডর-পরবর্তী সময়ে এ উপজেলায় ৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র টাইপ বিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে বিদেশি দাতা সংস্থা জাইকা ২টি, বেসরকারি সংস্থা কারিতাস ৮টি, গিশব ৪টি, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থ সহায়তায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ১১টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে। এ ছাড়া জাইকা ২টি ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১টি মসজিদ কাম আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। প্রতিটি আশ্রয় কেন্দ্রে দূর্যোগকালীন সময়ে ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধীদপ্তরের অধীনে আরও ৪টি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড় গোর্কির পর বিশ্ব ব্যাংক ৩১টি ও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি সংস্থা কারিতাস ৩৭টি এবং রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ১টি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের মহাপ্লাবনে পানির উচ্চতা বেড়ে গিয়ে কলাপাড়ায় ৪৬০৯ জন লোকের প্রানহানি ঘটে। এরপর মানুষে জীবন রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও বেসরকারি সংস্থা মোট ৮৪টি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এগুলোর অধিকাংশ অনেক আগেই ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সরকার অধীদপ্তর বেশ কয়েক বছর আগে এগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের ২০০১ সালের আদম শুমারির হিসাব অনুযায়ী এ উপজেলায় ২ লাখ ৭৮ হাজার জনসংখ্যা রয়েছে। যা বর্তমানে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সে হিসেবেও আরও অধিকসংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবমতে, বর্তমানে যেসব আশ্রয় কেন্দ্র ও সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে তাতে বড়জোর ৮০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ দুর্যোগের সময়ে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পাড়বে। সে হিসবে এ উপজেলার বাকি দুই লক্ষাধিক মানুষ নিরাপদ আশ্রায়ের বাইরে থেকে যায়।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরতীরে অবস্থানের কারণে এ উপজেলা বরাবরই সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের দিক থেকে প্রবল ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার লতাচাপলী, মিঠাগঞ্জ, খাপড়াভাঙ্গা, নীলগঞ্জ ইউনিয়নে পরিত্যাক্ত ঘোষনার পরও জরাজীর্ণ আশ্রয় কেন্দ্র গুলিতে এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান চালু রয়েছে। এর ফলে যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরণের দূর্ঘটনা ।

গ্রামীণ জনপদের একাধিক লোক জানায়, যেসব আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোর একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মাইল । ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় এ উপজেলায় ১০৪ জন লোক মারা যায়। তাঁদের অধিকাংশই বেড়ি বাঁধের বাইরে বসবাস করতো। আবহাওয়ার বিপদ সংকেত পেয়ে অধিক দূরত্বের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সময় পানির চাপে পড়ে এসব লোক মারা যায়। এ উপজেলার বর্তমান জনসংখ্যা অনুযায়ী কমপক্ষে ২০০ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন বলে মনে করছে এখানকার বাসিন্দারা।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর রহমান বলেন, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মানুষের জন্য দূর্যোগ কালীন সময় আশ্রয় নিতে আরও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তা ছাড়া জানমাল রক্ষার জন্য গ্রামীণ জনপদে আরও কিছু মাটির কিল্লা তৈরি করা হবে। পুরনো যেসব কিল্লা নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো সংস্কার করা হবে। এর ফলে দুর্যোগকালীন জীবনের ঝুঁকি কমে আসবে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ