,



মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘দায়হীন’ তদন্ত

 

ডেসটিনি ডেস্ক

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। প্রতিবেদনে রাখাইনে হত্যাযজ্ঞে নিজেদের জড়িত থাকার কোনো বিষয় উল্লেখ করেনি তারা। গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেনাবাহিনীর এই প্রতিবেদনকে ‘চোখে ধুলা’ দেওয়ার চেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ এক তদন্ত প্রতিবেদনে রাখাইন সংকটে নিজেদের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে উল্টো রোহিঙ্গাদের ওপর দোষ চাপানোর ঘটনাকে ‘চোখে ধুলো দেওয়া’র প্রচেষ্টা মনে করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ-যৌন নিপীড়ন ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও প্রকাশিত সেনা-তদন্ত প্রতিবেদনে তা অস্বীকার করা হয়েছে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংকটের কারণ হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, জাতিগত নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী করলেও প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে সেনাবাহিনী উল্টো দোষ চাপিয়েছে ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’দের ওপর। সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। তারা জাতিসংঘের তদন্ত কমিটিকে ওই অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতার পর রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা ও ধর্ষণ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথায় উঠে আসে সেনাসদস্যদের নৃশংসতা, বর্বরতা। তবে এই সব কিছুই অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নিরপরাধ গ্রামবাসীদের’ তারা গুলি করেনি, নারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন চালায়নি, গ্রামবাসীদের নির্যাতন করেনি, আটক বা হত্যা করেনি, তদের সম্পদ, সোনা, পশু চুরি করেনি, মসজিদে আগুন দেয়নি, বাড়িতে আগুন দেয়নি এবং তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য জোর করেনি। সেনাবাহিনী বলে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসীরাই গ্রামবাসীদের বাড়িতে আগুন দেয়। তাদের ভয়েই পালিয়ে যায় গ্রামবাসীরা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক মুখপাত্র জানান, একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সেনাবাহিনী দায় স্বীকার করবে না। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এই সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। ওই অঞ্চলে দায়িত্বপালন করা জেনারেলকে বদলি করা হয়েছে। তবে কোনো কারণ দেখানো হয়নি। আজ বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী রেক্স টিলারসনের মিয়ানমার সফর করার কথা রয়েছে। ২৫ আগস্ট রাখাইনে পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার পর সামরিক অভিযান জোরদার করে মিয়ানমার। তখন থেকেই রাখাইনে প্রবেশাধিকার নেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংবাদমাধ্যমের। সে কারণে সেখানকার চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিবিসিসহ বেশ কিছু সাংবাদিককে সঙ্গে করে ওই এলাকা ঘুরে দেখিয়েছে মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা। বিবিসির দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদদাতা জোনাথন হেড জানিয়েছেন, তিনি নিজেই রাখাইনের বৌদ্ধদের রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিতে দেখেছেন। সে সময় সেখানে সেনাবাহিনী মিয়ানমারের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী উপস্থিত ছিল। অ্যামনেস্টি সত্য অনুসন্ধানে জাতিসংঘের অনুসন্ধানকারীদের ওই এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

রোহিঙ্গা হত্যার বিষয়ে সু চিকে মুখ খুলতেই হবে : ইউ-টু

 

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছেই। এই ইস্যুতে বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনও সরব হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংগঠন থেকে ধারাবাহিক প্রত্যাখ্যানের পর এবার সু চির প্রতি বিষোদগার করেছে বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড ‘ইউ-টু’। সোমবার ইউ-টু’র পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সংখ্যালঘু মুসলিম হত্যার বিষয়ে সু চিকে নীরবতা ভাঙতেই হবে। আরো বলা হয়, সুচির চোখের সামনেই ঘটে যাওয়া রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনাবলি শুনে আমাদের হৃদয় ভেঙে গেছে। সু চির অবস্থানে থেকে নীরব থাকা সম্মতি ছাড়া কিছু নয়। শুধু সু চি নয়, মিয়ানমারের সেনা প্রধান মিন অং লিংকে উদ্দেশ্য করেও ক্ষোভ প্রকাশ করে। জানা গেছে, স ুচি যখন সেনা শাসকদের দ্বারা গৃহবন্দি ছিল তখন ইউ-টু ব্যান্ডই তার মুক্তির জন্য প্রচারণা চালিয়েছিল। গত আগস্টে মিয়ানমারের আরাকানে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় দেশটির সেনারা। পরবর্তীতে ওই এলাকা থেকে ৮ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাউং সোয়েকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে রাখাইনে অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সোয়ে টিন্ট নাইংকে। সোমবার মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই তথ্য জানিয়েছে। রাখাইনে সেনা অভিযানে ব্যাপক সহিংসতা, হত্যা, ধর্ষণ ও নিপীড়নের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনা ও চাপের মুখে রয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এখন পর্যন্ত ৮ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জীবন বাচাঁতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ এনেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, রোহিঙ্গারা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হচ্ছে বলে দাবি করেছে। মিয়ানমার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আমন্ত্রণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব এনেছে। রোববার জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি প্রমীলা প্যাটেন দাবি করেছেন, রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের সময় সেনাদের দ্বারা রোহিঙ্গা নারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তিনি বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে উত্থাপনের কথা জানান। এই পরিস্থিতিতে রাখাইনের অভিযানে দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা বদল করা হলো। তবে এই বদলির কোনো কারণ জানানো হয়নি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ শাখার উপপরিচালক মেজর জেনারেল আই লইন বলেন, কেন তাকে বদলি করা হয়েছে আমি জানি না। তাকে নতুন কোনো দায়িত্বে দেওয়া হয়নি। তাকে রিজার্ভে রাখা হয়েছে। শুক্রবার মেজর জেনারেল সোয়েকে বদলির আদেশ দেওয়া হয় বলে জানান উপপরিচালক। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের মিয়ানমার সফরের আগ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। আগামী সপ্তাহে টিলারসন মিয়ানমার সফর করবেন। এর আগে অক্টোবরে রাখাইনে ক্লিয়ারেন্স অপারেশনে সেনা সদস্যদের আচরণের বিষয়টি তদন্ত করার ঘোষণা দেয় দেশটির সেনাবাহিনী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ঘোষণা করার একদিনের মধ্যে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছিল সেনাবাহিনী।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ