মঙ্গলবার, আগস্ট ১৪, ২০১৮ | ৩০, শ্রাবণ, ১৪২৫
 / প্রথম পাতা / নজরদারিতে কয়লা চুরির সিন্ডিকেট
মাসুদ শায়ান
Published : Friday, 10 August, 2018 at 9:07 PM, Count : 16
কয়লা কেলেঙ্কারি উদঘাটন করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। সন্দেহভাজনদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যে কোনো মূল্যে হোতাদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে সরকারের শীর্ষ মহল। খনি থেকে ১ লাখ ৪২ জাহার টন কয়লা গায়েবের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে সরকার। এতে দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ সময়ে এসে চরম ইমেজ সংকটের মুখে পড়েছে সরকার। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কেলেঙ্কারি, ঋণের নামে ব্যাংকের অর্থ লোপাট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে স্বর্ণ গায়েব ইত্যাদি কারণে সরকার বেশ চাপের মুখে পড়ে। তার ওপর প্রায় দেড় লাখ টন কয়লা উধাও ঘটনা প্রকাশিত হওয়ায় ভোটের আগে সরকার ব্রিতকর অবস্থার মুখে পড়েছে। আসন্ন একাদশ নির্বাচনের আগেই সরকার কয়লা কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে চায়। যাতে ভোটের আগে এটা কোনো ইস্যু হতে না পারে। গায়েব হয়ে যাওয়া কয়লার রহস্য উদ্ঘাটনে যথারীতি কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ, গোয়েন্দা বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন। ভবিষ্যতে কয়লা নিয়ে যেন কোনো কলঙ্ক না হয়, সে বিষয়েও নেয়া হচ্ছে উদ্যোগ। নজরদারির আওতায় আসছে কয়লা খনি সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস সূত্র এবং দিনাজপুরের স্থানীয় একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, কয়লা উধাও হওয়ার ঘটনায় সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থাও তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। পেট্রোবাংলা থেকে জ্বালানি বিভাগে ৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছেÑ খনি থেকে কয়লা চুরি রোধে করণীয়, কয়লা উত্তোলন থেকে শুরু করে বিক্রি বা ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্রতি দফায় পরিমাপ এবং এর সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা, অবৈধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া, অন্যত্র বিক্রি না করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার জোগান নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলন করে রাখা ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা যার মূল্য ২২৭ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। একই সঙ্গে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে বদলি করা হয়েছে। কয়লার গরমিলের ঘটনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো. কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৬ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পুনরায় কয়লা উত্তোলন শুরু হবে আগস্ট মাসের শেষে। এ সময়ের মধ্যে পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদ রয়েছে বলে ইতিপূর্বে কয়েক দফা পিডিবিকে নিশ্চিত করে খনি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু খনি কর্তৃপক্ষ তিন-চারদিন আগে পিডিবিকে জানিয়ে দেয় খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ প্রায় শেষ পর্যায়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আর বেশিদিন কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা সরবরাহ কমিয়ে দেয়। বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৮শ’ থেকে ১ হাজার টন কয়লা সরবরাহ করা হচ্ছে। তা দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে একটি ইউনিট চালু রাখা হয়েছে এবং উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১৪০ মেগাওয়াটে। খনি কর্তৃপক্ষের হিসাবে কোল ইয়ার্ডে কয়লা থাকার কথা প্রায় দেড় লাখ টন। কিন্তু বাস্তবে সর্বশেষ মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টন কয়লা অবশিষ্ট থাকলেও এখন তাও শেষ।
পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক (খনি ও খনিজ) মুঈনুল আহসান বলেন, চুরি ঠেকাতে হলে খনি থেকে রাতের বেলা কয়লা সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। যেহেতু ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য প্রতিদিন ৫ হাজার টন কয়লা দরকার, সেহেতু খনির কয়লা বাইরের গ্রাহকের কাছে বিক্রি বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, দ্য মাইন্স অ্যাক্টÑ১৯২৩ অনুসারে খনিতে একজন দক্ষ মাইনিং প্রকৌশলী থাকার কথা থাকলেও আমাদের খনিগুলোয় তা নেই। মাইনিং সেক্টরে দক্ষ জনবল তৈরি জরুরি হয়ে পড়েছে। এ কারণে এখনো বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে উত্তরাঞ্চলের ৮টি জেলার প্রায় দেড় কোটি মানুষ।

খনি কোম্পানি কয়লা উধাওয়ের সাথে জড়িত
 
খনি থেকে উৎপাদিত কয়লা সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে না দিয়ে খোলা বাজারে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে আলামত মিলেছে। এর মাধ্যমে অন্তত ২২৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন জড়িতরা। আর এ অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির খেসারত দিচ্ছেন উত্তরাঞ্চলের জনগণ। বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন পুরোদমে বন্ধ হয়ে গেছে। ওইদিন রাত থেকেই রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের জেলাগুলোতে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে গেছে।
বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত কয়লার হিসেবে গড়মিলের ঘটনায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে গোটা খাতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন কয়লা ‘উধাও’ হওয়ায় সন্দেহের তীর পড়েছে খনিটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সরকারি কোম্পানি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির (বিসিএমসিএল) শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে পুরো ঘটনার আগাগোড়া খতিয়ে দেখতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদকে এ বিষয়ে ‘পূর্ণ তদন্ত’ করে দ্রুত প্রতিবেদন দিতেও বলেছেন তিনি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস সূত্র এবং দিনাজপুরের স্থানীয় একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, কয়লা উধাও হওয়ার ঘটনায় সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থাও তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা এবং স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে ৫ লাখ ৪০ হাজার ৫৭৮ টন এবং স্থানীয় খোলা বাজারে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৫১২ টন কয়লা বিক্রি করে বিসিএমসিএল। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা বাজারে কয়লা বিক্রি করা হয়। ওই সময়ে প্রতি টন ১৭ হাজার টাকা দরে অন্তত ১০০ টন কয়লা বিক্রি করা হয়েছিল। মার্চে কয়লার মজুদ কমে গেলে বাইরে কয়লা বিক্রি স্থগিত করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে খনি কোম্পানি। বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ওই এলাকায় গড়ে ওঠা তিনটি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করার পর অবশিষ্ট কয়লা খোলাবাজারে বিক্রি করতে পারে বিসিএমসিএল।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির সদ্য অপসারিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ কয়লা উধাওয়ের ঘটনায় অসংলগ্ন তথ্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে এই কয়লার খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু হয় এবং এই পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সময় সিস্টেম লস বা উৎপাদন ঘাটতিকে বাদ দেয়া হয়নি। খনি থেকে কয়লা উৎপাদনের পর কয়লাতে জ্বলীয় বাষ্প থাকার কারণে পরবর্তী সময়ে ১ থেকে ২ শতাংশ কয়লা ওজনে কমে যায়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ২ শতাংশ সিস্টেম লস ধরা হয়। সে হিসেবে যদি দেড় শতাংশ সিস্টেম লস ধরি, তাহলে এই ঘাটতি সঠিক রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিস্টেম লস হতেই পারে। কিন্তু কয়লারতো বাহ্যিক আকৃতি আছে। ইয়ার্ডে কী পরিমাণ কয়লা মজুদ আছে তা সংশ্লিষ্টরা স্বাভাবিকভাবে দেখেও বলতে পারেন। এতে এত বড় ভুল হওয়ার কথা নয়। উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৬ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।





দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162