মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৩, ২০১৮ | ২৮, কার্তিক, ১৪২৫
 / মতামত / আশুরার ফজিলত
মাহাবুব আলম
Published : Wednesday, 12 September, 2018 at 7:23 PM, Update: 12.09.2018 7:27:14 PM, Count : 280
আশুরার ফজিলত

আশুরার ফজিলত

আরবি ১২ মাসের প্রথম মাস মুহাররম।এই ১২ মাসের মধ্যে চার মাসকে সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই চার মাসকে আরবের অন্ধকার যুগেও বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা হতো। সেই চারটি মাস কোনগুলো সে সম্পর্কে  হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, এক বছরে ১২ মাস। এর মধ্যে চার মাস বিশেষ তাৎপর্যের অধিকারী। এর মধ্যে তিন মাস ধারাবাহিকভাবে ( জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম) এবং চতুর্থ মাস মুজর গোত্রের রজব মাস। এই চারটি মাসের মধ্যে মুহাররম মাস শরিয়তের দৃষ্টিতে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আবার এই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণও অনেক। মুহাররম মাস সম্মানিত হওয়ার বিশেষ এক কারণ হলো আশুরা। যা ১০ই মুহাররম তারিখে পালিত হয়। 

এই দিনে হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারী ইমানদারগণ কে আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনের জুলুম থেকে নাজাত দিয়েছিলেন। এবং ফেরাউনকে তার বাহিনী সহ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিলেন।

সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি আশুরার দিনে ইহুদীদের রোযা পালন করতে দেখলেন।  তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন দিন যে তোমরা রোযা পালন করছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিন যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মুসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিনে রোযা পালন করেছেন। এ কারণে আমরাও এ দিনে রোযা পালন করে থাকি। এ কথা শুনে মহানবী (সা.) বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আ.)- এর অধিকতর ঘনিষ্ট ও নিকটবর্তী। অতঃপর রসুল (সা.) নিজেও রোযা রাখলেন এবং অন্যদেরকেও রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)

রসুল (সা.) ইহুদীদের কথা বিশ্বাস করে রোযা পালন করেছেন এমন নয়। সম্ভবত আল্লাহ তায়ালা অহীর মাধ্যমে ইহুদীদের এ বক্তব্যের সত্যতা জানিয়েছিলেন অথবা তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে এর সত্যতা উপলদ্ধি করেছিলেন। 

এ দিনটি আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই প্রিয়। তাই তিনি এ দিনের রোযাকে সর্বোত্তম বলেছেন।  যেমন হাদিসে এসেছেহযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সা.)বলেছেন, রমযানের ফরয রোযার পর সর্বোত্তম রোযা হলো মুহাররম মাসের রোযা।(অর্থাৎ আশুরার দিনের রোযা) এবং ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো রাতের নামায। (মুসলিম) 

একটি হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার আগে আশুরার রোযা উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর ফরয ছিল। পরবর্তীতে রোমযানের রোযা ফরয হওয়ায় ওই বিধান রহিত হয়ে যায় এবং তা নফলে পরিণত হয়। হাদিস শরিফে হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের আশুরার রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। এ বিষয়ে নিয়মিত তিনি আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমযানের রোযা ফরয করা হলো, তখন আশুরার রোযার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না এবং নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না। (সহিহ মুসলিম)

আশুরার দিনে রোযা রাখা গুনাহ মোচন হওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম। হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করিম (সা.) বলেন, আমি আশা করি আশুরার রোযার উসিলায় আল্লাহ তায়ালা অতীতের এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। (জামে তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)তবে আশুরার নফল রোযা দুইটি রাখা অতি উত্তম। প্রথমটি আশুরার দিন, দ্বিতীয়টি আশুরার আগের বা পরের দিন।এক হাদিসে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ কর, আশুরার আগে বা পরে আরও একদিন রোযা রাখ। (মুসনাদে আহমাদ)

তাই আমরা যারা রোযা রাখব তারা অবশ্যই দুইটি রোযা রাখার চেষ্টা করব।
তবে আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে আশুরা বা ১০ই মুহাররম বলতে শুধু কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা বা সেই উদ্দেশ্য ইবাদত পালন নয়। অনেকেই না বুঝে অথবা ভ্রান্ত প্ররোচনায় পড়ে আশুরার ঐতিহ্য বলতে শুধু মহানবী  (সা.)- এর প্রিয়তম দৌহিত্র, হযরত হুসাইন (রা.)- এর শাহাদাত ও নবী পরিবারের কয়েকজন সম্মানিত সদস্যের রক্তে রঞ্জিত কারবালার ইতিহাসকেই বুঝে থাকে। তাদের অবস্থা ও কার্যাদি দেখে মনে হয়, কারবালার ইতিহাসকে ঘিরেই আশুরার সব ঐতিহ্য, এতেই রয়েছে আশুরার সব রহস্য। আসলে বাস্তবতা কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং আশুরার ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। কারণ কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ৬১ হিজরির ১০ই মুহাররম। আর আশুরার রোযার প্রচলন চলে আসছে ইসলাম আবির্ভাবেরও বহুকাল আগ থেকে।

তবে এ কথা সত্য যে, হিজরি ৬১ সনে আশুরার দিন কারবালার ময়দানের দুঃখজনক ঘটনাও মুসলিম জাতির জন্য খুবই বেদনাদায়ক।সেইদিন হযরত হুসাইন (রা.) ইয়াযিদের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জিহাদ করে মুসলিম জাতির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত এক জলন্ত উদাহরণ রেখে গেছেন। তিনি শিখিয়েছেন শত বাধা বিপত্তি থাকা সত্তেও জালিমদের কাছে মাথা নত না করতে। প্রতিবছর আশুরা আমাদের অন্যান্য ঘটনার সাথে সাথে এই দুঃখজনক ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এও বাস্তব যে এ ঘটনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পেরে আজ অনেকেই কুসংস্কার ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। তাই সকল ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার থেকে বিরত হয়ে সঠিক ইসলাম আমাদের পালন করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। আমিন!
                     
মাহাবুব আলম

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162