রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮ | ৮, আশ্বিন, ১৪২৫
 / রাজনীতি / রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার
যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্যের প্রস্তাবিত
মাসুদ শায়ান, ডেসটিনি অনলাইন :
Published : Thursday, 13 September, 2018 at 9:43 PM, Count : 759
রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার

রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার

* সংলাপের পথ খোলা রেখে এগুচ্ছে সরকার
* শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন সরকারে থাকছেন যারা


সারাদেশে নির্বাচনী উত্তাপ শুরু হয়ে গেছে। তবে নির্বাচন কার অধীনে, কিভাবে হবে? এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতুহল বেড়েই চলেছে। বিএনপি কি আদৌ একটি সফল আন্দোলন করতে পারবে? আদায় করতে পারবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার? যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্য নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা নিয়ে কাজ করছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে আগামী মাসে। আর চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে পারে নির্বাচন। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি দীর্ঘদিন যাবৎ নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজনীতির তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্যও নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তাব করেছে। তবে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাইছে জাতীয় ঐক্যের দলগুলো। এই ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে একটি রূপরেখাও তৈরি করা হচ্ছে।

এছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২ অনুযায়ী, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নির্বাচন পূর্ব সময়ে তাদের ক্ষমতার বলয় সংকুচিত হয়ে যায়, তারা বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন না। যেহেতু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, সেহেতু সাংবিধানিকভাবেই তার সব ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে যাবে এবং রাষ্ট্রপতিই সরকারের সকল দায়িত্ব পালন করবেন। এমন প্রস্তাব রেখেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে জাতীয় ঐক্য।

জাতীয় ঐক্যের রূপরেখা অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান দলীয় প্রধানমন্ত্রী অকার্যকর হয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে কোনো দফতর বা প্রায়োগিক কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ জাতীয় কোনো দাবি জাতীয় ঐক্যের নেই। বরং যখনই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে তখন সচিবদের নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করেছে দলটি। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে নির্বাচনকালীন সরকারের কার্যক্রম, এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা হবে গৌণ।

সংবিধান মেনে কীভাবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায় সে বিষয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে রূপরেখা তৈরি করছেন কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী। এই রূপরেখা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। কয়েক দিন আগে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সঙ্গে দেখা করেন ড. কামাল হোসেন। রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. কামাল ও তার সমমনাদের কোনো আপত্তি থাকবে না বলেই মনে করা হয়।

এদিকে ক্ষমতাসীন সরকারে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, শিগগিরই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে এবং সেখানে তিনি থাকবেন। তবে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো চূড়ান্ত করেননি। আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই আওয়ামী লীগের এই পদক্ষেপগুলো নেয়া হবে। সংলাপের পথ খোলা রেখেই সরকার এ পথে এগুচ্ছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পরপরই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের লক্ষ্যে সরকারের পদক্ষেপে গ্রহণ করেছে।

নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৪ দল ছাড়াও সমমনা অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। বাম-ফ্রণ্টসহ যে রাজনৈতিক দলগুলো গতবার নির্বাচন করেনি কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সেসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও ধারাবাহিক সংলাপ করবেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনা হবে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গেও। এসব আলোচনা থেকে প্রধানমন্ত্রী ধারণা নিবেন, তারা নির্বাচনে কি ধরনের সুযোগ সুবিধা বা কি ধরনের পরিবেশ চায়। সেই অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে বিএনপির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক সংলাপে যাবেন না আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না এমন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় যাবেন না প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির সঙ্গে সংলাপ না করলেও বর্তমানে দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকা কর্নেল অলি আহমেদের এলডিপি, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন কল্যাণ পার্টি- এরকম কিছু দলের সঙ্গে সংলাপ করবে আওয়ামী লীগ। এমনকি ইসলামপন্থী দল হিসেবে পরিচিত হেফাজতে ইসলামসহ আরো কিছু ইসলামপন্থী দলের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ সংলাপ করবে। সংলাপের মাধ্যমে যে সুপারিশগুলো হবে, সেই সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে নির্বাচন তফসিল ঘোষণার আগে বা আগের এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেবেন। ভাষণে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অঙ্গীকার করবেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকার কেন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সরকার কীভাবে নির্বাচনকে বিশেষায়িত করবে-তার একগুচ্ছ বিবরণ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তাছাড়া সকল দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সাক্ষাৎ করে মন্ত্রিসভার আকার ছোট করা হবে। জানা গেছে, ১০-১২ জনের মন্ত্রিসভা হতে পারে। এখানে একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী থাকবেন। বর্তমান সিনিয়র মন্ত্রীদের নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। এছাড়া কিছু নতুন মুখও আসতে পারে। এছাড়া অধিকাংশ মন্ত্রীকেই তখন পদত্যাগ করতে হবে। আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নির্বাচন করবেন না, সেহেতু তিনি নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকবেন। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী গতবারও অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন, এবারও তিনি নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকবেন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও গতবার অন্তর্বতীকালীন মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন, এবারও থাকছেন তিনি। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গতবার অন্তর্বতীকালীন মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন, এবারও তাকে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ গতবার মন্ত্রিসভায় ছিলেন, তেমন সাফল্য না থাকা সত্ত্বেও এবারও তাকে রাখা হবে। নির্বাচনের পরপরই পাঠ্যপুস্তক প্রদানের বিষয়টি থাকায় মন্ত্রিসভায় রাখা হবে শিক্ষামন্ত্রীকে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মন্ত্রিসভায় থাকবেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। জাসদ থেকে মঈনুদ্দিন খান বাদলকে (বিভক্ত জাসদের একটা অংশ) মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। জাতীয় পার্টির একাধিক নেতার মধ্যে রওশন এরশাদও থাকতে পারেন মন্ত্রিসভায়। ইয়াফেস ওসমান ও মোস্তাফা জব্বার, আওয়ামী লীগ এই দু’জন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী আছেন। সংবিধান অনুযায়ী এক-দশমাংশ টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী রাখার কথা থাকলেও এই দুজনের আসার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনে আসা দলগুলোর মধ্যে থেকে কাউকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করা হতে পারে। অপরদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এ. কে. এম শাহজাহান কামাল, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিকসহ বেশ কিছু সিনিয়র মন্ত্রীদের এবার নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। গতবার নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম থাকলেও এবার তাকে রাখা নাও হতে পারে। মন্ত্রিসভার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী এখনো চূড়ান্ত করেননি। তবে যেসব মন্ত্রীর দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাদেরকে রেখে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র। মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি সংলাপের আয়োজন করবেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না, তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংলাপের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে সঠিক সময়ে নির্বাচন করা সম্ভব না হলেও সংলাপের পথ উন্মুক্ত হবে। দেশে সংঘাতের আশংকাও প্রশমিত হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162