আজ শনিবার, ১৬ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৯ এপ্রিল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত  পাট রফতানিতে হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা
মাসুদ শায়ান
Published : Thursday, 12 January, 2017 at 10:08 PM, Count : 131
ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত  পাট রফতানিতে হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কাভারত সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তে পাট রফতানিতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। এতে হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এ ভর্তুকির অজুহাত তুলে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রফতানিতে অ্যান্টিং-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। ফলে চলতি অর্থবছরেই রফতানিযোগ্য দুই লাখ টন পাটপণ্য রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ জুট মিলস এসোসিয়েশন (বিজেএমএ) মঙ্গলবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছে চিঠি লিখেছে। বিজেএমএ সূত্র জানায়, পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাটপণ্যে ভর্তুকির মাধ্যমে ডাম্পিংয়ের অভিযোগ তোলেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে মামলা করেন ভারতের পাট ব্যবসায়ীরা। ভারতের পাট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (আইজেএমএ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রফতানিকারকরা ভর্তুকি মূল্যে ভারতে পাট রফতানি করছেন। তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি অনেক বেড়েছে। এর প্রভাবে স্থানীয় শিল্প-সংশ্লিষ্টরা ব্যবসার ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পাচ্ছেন না। তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পাট পণ্যে ভর্তুকির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নেন দেশটির পাটপণ্য উৎপাদনকারীরা। তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়ার পর এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব অ্যান্টি-ডাম্পিং অ্যান্ড অ্যালাইড ডিউটিজ (ডিজিএডি)। প্রায় এক বছর ধরে তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে সংস্থাটি। এতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজস্ব বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশ ও নেপালের পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়া হয়। যদিও দেশটির এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় ৯০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে তাতে ভারত সরকার সিদ্বান্ত পরিবর্তন করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রতি টন পাটপণ্যে সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৩৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দিতে হবে। এতে চলতি অর্থবছরে দুই লাখ টন পাটপণ্য রফতানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পাটপণ্য বর্তমানে রফতানির অপেক্ষায় দেশের স্থলবন্দরগুলোয় রয়েছে। আর কিছু ক্ষেত্রে এলসি খোলা হয়েছে এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন। এদিকে নগদ অর্থ সহায়তার মাধ্যমে ডাম্পিং হচ্ছে না বলে বরাবরই দাবি করে আসছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও ভারতের ব্যবসায়ীদের ডাম্পিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে, সরকার পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা দিচ্ছে সত্য, তবে তা দেয়া হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকেই। এতে মূল্য নির্ধারণে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি সহজ নয়। বাংলাদেশ জুট ডাইভারসিফায়েড প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মো. রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, ভারত একতরফা ভাবে এমন সিদ্বান্ত নিয়েছে। এতে হাজার কোটি টাকার লোকসানের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় এ সংকটের সমাধান করা বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এতে আমাদের পাট শিল্প বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। সরকারকে এখন কূটনৈতিক পথে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে রফতানি মমূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ পাটপণ্য রফতানি করা সম্ভব হবে না। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম অবশ্য এ সংকটের জন্য বাংলাদেশের পাট ব্যাবসায়ীদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণেই ভারত একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে ডব্লিউটিওর কাছে আপিল করা হবে। আগামী রোববারের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করা হবে। আইনগত ব্যবস্থা ছাড়াও কূটনৈতিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বাজারে পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ানো ও রফতানি বাজার বহুমুখী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। আগামী মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এ বিষয়ে একটি নোটশিট দেয়ার প্রচেষ্টা থাকবে। এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। দ্রুত এ সংকটের সমাধান করা হবে বলে তিনি জানান। ভারতের এ সিদ্ধান্তে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পাটপণ্য রফতানিতে ধস নামার শঙ্কা করছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। এ বন্দর দিয়ে প্রতি বছর ভারতে প্রায় দুই লাখ টন পাটসুতা, বস্তা ও চট রফতানি করে আসছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে পাটসুতার পরিমাণ দেড় লাখ টনের বেশি। ব্যবসায়ীরা এত দিন প্রতি টন পাটসুতা ৮০০-৯০০ ডলারে রফতানি করে আসছিলেন। এখন এর সঙ্গে নতুন হারে শুল্ক যোগ হলে যে দাম দাঁড়াবে, তাতে ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। এদিকে আমাদের বেনাপোল প্রতিনিধি এম এ রহিম জানান, ভারত পাটজাত পণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করায় বেনাপোল স্থলপথে রফতানি বন্ধ-আটকা অর্ধশত ট্রাক আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করেই কোনো নিদের্শনা ছাড়ায় ভারত সরকার বাংলাদেশি পাটজাত পণ্যে উচ্চ হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে বেনাপোল স্থলপথে ভারতে পাটজাতপণ্য রফতানি হুমকির মুখে পড়েছে। গত ৫দিনন ধরে বেনাপোলে আটকে আছে ৬৮টি পাটপণ্য বোঝায় ট্রাক। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে। এর ফলে বেকার হয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীর সাথে সংশ্লিষ্টরা-পাট পণ্য ছাড়ায় দেশের ৫৭টি ইন্ডাস্ট্রির উপর শুল্কআরোপ করেছে ভারত। পাটপণ্য রফতানিকারক খুলনার প্রবল শিপিং লাইনের প্রতিনিধি মহাসিন আলী ও মুন ইন্টার প্রাইজ জুট মিলের প্রতিনিধি জাহান আলী বলেন। ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশি পাটজাতপণ্যে উচ্চ হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে গেজেট প্রকাশ করেছে। এর ফলে ভারতে এখন পাটসুতা, চট ও বস্তা রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মেট্রিক টনে ১৯ থেকে ৩৫২ মার্কিন ডলার পর্যন্ত শুল্ক দিতে হবে। ভারতের গেজেট অনুযায়ী,বাংলাদেশি পাটজাতপণ্য রফতানিতে আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত শুল্ক দিতে হবে। ভারতীয় মুদ্রায় এই শুল্কের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। মুন ইন্টারন্যাশনাল জুট মিলস-এর প্রতিনিধি জাহান আলি বলেন, ৬০টন পাটসুতা রফতানি করতে আমাদের উল্টো ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়ে যাবে। কারণ, শুল্কের অর্থ আমদানিকারক কেটে রাখবে। ভারতে রপ্তানি কমে যাবে। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পাটপণ্য রফতানির জন্য অন্য বাজারের দিকে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে প্রতিদিন বেনাপোল দিয়ে ভারতে রফতানি হতো প্রায় দেড়শ ট্রাক পাট ও পাটজাত পন্য। সেখানে গতকাল গেছে ৭ ট্রাক পাট। বন্ধ হয়ে গেছে পাটপন্য রফতানি ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইন্ডাস্ট্রিসহ রফতানিকারকরা।



« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
সম্পাদক কর্তৃক ১৪৬ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (৪র্থ তলা), ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত ও ডেসটিনি প্রিন্টিং প্রেস, ১৩/২/এ কেএম দাস লেন, গোপীবাগ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
যোগাযোগ : আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর, ঢাকা-১০০০।
ফোন : ৭১৭৪৭০২, ৯৫৫৯৯৪৯, ৯৫৫৯০০৬, বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০, email: ddaddtoday@gmail.com ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com, e-mail:destinyout@yahoo.com, dainikdestiny@gmail.com, destiny24news@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft