আজ বুধবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
 / মতামত / একটি পরিসংখ্যান ও সংখ্যালঘু সমাচার
রণেশ মৈত্র
Published : Wednesday, 6 December, 2017 at 4:50 PM, Count : 63
একটি পরিসংখ্যান ও সংখ্যালঘু সমাচার

একটি পরিসংখ্যান ও সংখ্যালঘু সমাচার

সম্প্রতি ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানবাধিকার প্রতিবেদন ’শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের খবরটি আরো অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও পরদিনের সংবাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমার চোখে পড়েছে। বলতে পারি, আমি বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।প্রতিবদেনটির শিরোনামে বলা হয়, ‘সাত বছরে সংখ্যালঘু সপ্রদায়ের ৩০২ জনকে হত্যা করা হয় : ১ হাজার ৬৯৯টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে  হামলা হয়।২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এই ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মাইনরিটি ওয়াচ ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।সংবাদ সম্মেলনে পাঠ করা লিখিত বক্তব্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওই সময়কালে ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘুদের ওপর নানা কাহিনী-নির্যাতনের চিত্রসহ তুলে ধরেন।তারা এই নির্যাতনগুলো প্রতিরোধকল্পে ১১ দফা দাবিও তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ, গুম, হত্যা, সম্পত্তি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বাড়িঘর দখল কার্যকরভাবে বন্ধ করা এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করার দাবি রাখে।এ কথাও জোরেশোরে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশবিরোধী কোনো রাজাকার হিন্দুদের মধ্যে থেকে পাওয়া যায়নি। তারা প্রকৃতপক্ষেই দেশপ্রেমিক। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর দিব্যি দেখা যাচ্ছে তারা নিজ দেশে পরবাসী। এখন যারা হিন্দুদের বাড়ি দখল, ধর্ষণ, হত্যা, লুণ্ঠন করছেন, তাদের নব্য রাজাকার বলে উল্লেখ করা হয়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হয়ে এই সাম্প্রদায়িক অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন।যেদিন এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো সেদিনই এবং তার পরের দিনগুলোতেও প্রতিদিনই বিভিন্ন সংবাদপত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত নরনারীকে নির্যাতন, মন্দির ও বিগ্রহগুলোয় ভাঙচুর ও সম্পত্তি গ্রাসের খবর প্রকাশিত হয় এবং তা আজও অব্যাহত আছে। এ যেন বিরামহীন এক স্থায়ী প্রক্রিয়া।এই ঘটনাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে কীভাবে? কেন তা সম্ভব হচ্ছে? কোথায় তার প্রতিকার? কতদিন লাগবে প্রতিকার হতে এসব প্রশ্ন কতজনকে ভাবিত করে তুলছে সংখ্যাগুরুদের মধ্যে তা জানি না। শুধু জানি যথেষ্ট সংখ্যক মানুষই এজাতীয় ঘৃণ্য কার্যকলাপের বিরোধী। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওই বিরোধিতা হলো নিষ্ক্রিয় তাই দুর্বৃত্তরা বেপরোয়া। তারা দেখছে কেউ তো তাদের প্রতিরোধ করছে না। না পুলিশ না প্রতিবেশীরা।এমনকি কচিৎ-কদাচিত দু-একটি মামলা কারো বিরুদ্ধে দায়ের হলেও গ্রেফতার নেই, গ্রেফতারের তৎপরতাও নেই। হঠাৎ কেউ গ্রেফতার হয়ে গেলে তার জামিন পেতে কোনো সমস্যা নেই। তাই তাদের চিন্তারও কোনো কারণ নেই।এই দুর্বৃত্তদের আমরা জামায়াতে ইসলামীর ক্যাডার লিডার বলে ভাবতেই ভালোবাসি। ঘটনার ৯০ ভাগ যে জামায়াতীরাই ঘটায় তাও সত্য। কিন্তু দৃশ্যত জামায়াতবিরোধী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এজাতীয় ঘটনা ঘটলে বিচার হয় না কেন? কেন পুলিশ তা প্রতিরোধে তৎপর হয় না? কেনই বা প্রতিবেশীরা এমনকি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও দলে বলে এ বিষয়ে আসে না অসহায় প্রতিবেশীদের বাঁচাতে- এ প্রশ্নের উত্তর আজো অজানাই থেকে যাচ্ছে। তবে কিছু কিছু জানাও যাচ্ছে।যা জানা যাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। এই ঘটনাগুলোর পেছনে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ইন্ধন রয়েছে। তাই প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও নিষ্ক্রিয় থাকেন এবং সে কারণেই প্রতিরোধের কাজে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।সর্বাপেক্ষা বড় নজির হলো, যা কখনই ভুলতে পারা যাবে না যে ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালেও তার পরপর সংঘটিত ব্যাপক  সাম্প্রদায়িক  সহিংসতামূলক কর্মকাণ্ড গুলোকে কেন্দ্র করে মাত্র চার বছর আগে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি একটি বছর ধরে পরিশ্রম করে যে বিশাল প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে বছর দুয়েকেরও বেশি আগে দাখিল করছে তাতে স্পষ্টতই কয়েক হাজার ঘটনার মধ্যে সহস্রাধিক মোকদ্দমার সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া সম্ভব। এই সন্ধান জানিয়ে সরকারকে দ্রুত ওই মোকদ্দমাগুলো দায়েরের সুপারিশ করা সত্তে¡ও আজ পর্যন্ত একটি মোকদ্দমাও দায়ের করা হলো না। অথচ প্রতিবারই সরকারের মন্ত্রীরা শিগগিরই মামলাগুলো দায়ের করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিতে কার্পণ্য করছেন। আজ প্রায় পনেরটি বছর অতিক্রান্ত কিন্তু কোনো মোকদ্দমা দায়ের হলো না, একটি অপরাধীরও শাস্তি হলো না।পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা থানার বনগ্রামে প্রায় দুবছর হলো প্রকাশ্যে দিবালোকে যে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে গেল তা নিয়ে আসামিদের নাম উল্লেখ করে এফআইআর দায়ের করা হলেও মামলার কোনো খোঁজখবর নেই।আসামিদের মধ্যে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তারাও জামিন নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইদানীং দুর্বৃত্তরা আর রাতে নয় প্রকাশ্যেই দিবাভাগে আক্রমণ চালাচ্ছে। মোকদ্দমা দায়েরের পরও তেমন একটা চোখে পড়ে না। তবে কি পুলিশও সাপ্রদায়িক সহিংসতা চালানো ওই দুর্বৃত্তদের সঙ্গে কোনো না কোনো কারণে অবস্থান নিয়েছে? প্রশ্নগুলো শুনতে যেমন খারাপ লাগে তুলতে তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগে। কিন্তু প্রশ্নটি কঠিনভাবেই বাস্তব। কঠিনভাবেই সত্য যে, স্বদেশে বিদেশি হয়েই যেন তাদের থাকতে হচ্ছে।আইনগতভাবে? হ্যাঁ, এটিও একটি বড় প্রশ্ন বটে। আমি বহু পুরনো কিন্তু সদা জীবন্ত একটি আইনের কথা বলি। ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। আসলে শত্রু সম্পত্তি আইন যা পাকিস্তানের আইয়ুব সরকার ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান ১৭ দিনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জারি করে এ দেশে বাংলা পরম্পরায় বসবাসরত কোটি কোটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নাগরিকের বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, বসতবাটি প্রভৃতি শত্রু সম্পতি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ব্যবস্থা করে তাদের দেশদ্রোহী বলে কার্যত ঘোষণা করে দেশত্যাগী হতে বাধ্য করেছিল তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে। আজ তারপর প্রায় অর্ধ শতাব্দী চলে যাচ্ছে। প্রায় ৪৫ বছর আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মৌলনীতিতে পরিবর্তন সাধন করে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান নামক ইসলামী রিপাবলিকের স্থানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বলে ঘোষণা করেন এবং চার মৌলনীতির অন্যতম হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে লিপিবদ্ধ করেন। সংবিধানে আরো বলা হয় এই রাষ্ট্রে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গগত কারণে কোনো নাগরিক মবৈষম্যের শিকার হবেন না রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই। আরও বলা ছিল পাকিস্তান আমলের যেসব আইন বাংলাদেশের মৌলনীতিগুলোর সংঘাতপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে সেগুলোর অস্তিত্ব আপনাআপনি বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। কিন্তু কার্যত কী দেখলাম? সম্ভবত ১৯৭৩ সালে শত্রু সম্পত্তি আইন ১৯৬৫-এর নাম পরিবর্তন করে ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন, ১৯৬৫’ বলে নতুন নামকরণ করে শত্রু সম্পত্তি আইনের সব ধারা উপধারা অব্যাহত রাখা হলো। ফলে ওই সম্পত্তিগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেল। মালিকরা ফেরত পেলেন না এবং বিস্ময়ের ব্যাপার আজও তা ফেরত পাননি।২০০১ সালে দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাদের মেয়াদের শেষদিকে পাস করলেন অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন। এই আইনে যেসব সম্পত্তির ওপর সরকারের দখল বজায় আছে সরাসরি অথবা লিজ প্রদানের মাধ্যমে সেগুলোর যদি মালিক বা তার উত্তরাধিকারী এ দেশের স্থায়ী বাসিন্দা ও নাগরিক হন তবে ট্রাইব্যুনালের কাছে কাগজপত্রসহ আবেদন জানালে ট্রাইব্যুনাল শুনানি অন্তে আবেদন যথার্থ বিবেচনা করলে আবেদনকারীকে ফেরতদানের আদেশ দেবেন। আবার কোনো সম্পত্তি যদি লিজ দেয়া থাকে এবং তার মালিকানা যদি কেউ দাবি না করেন তবে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার পাবেন লিজগ্রহীতা। তার আগে এই সম্পত্তিগুলোর জন্য সরকার ছয় মাসের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করবে বলে আইনে বলা হয়েছিল কিন্তু সেই ছয় মাসের আগেই সরকারের মেয়াদ শেষ হয় এবং নতুন নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতাসীন হন।বিএনপি ক্ষমতায় এসে আইনটি অকার্যকর করে রেখে দেয়। গত ২০০৮ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ওই প্রত্যার্পণ আইন প্রণয়ন করে এবং দফায় দফায় মালিকানা দাবি করে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার সময় বাড়াতে থাকে। ভারতেও শত্রু সম্পত্তি আইন করা হয়েছিল। যে আইনে মুসলিমদের সম্পত্তি নেয়া হয়নি। যেসব ব্যাংক ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানিদের মালিকানায় ভারতে কর্মরত ছিল সেগুলো ওই আইনে সরকার নিয়ে নিয়েছিল যুদ্ধ শেষে আবার তা ফেরতও দিয়ে দেয় মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। এ দেশে এমন হাল হওয়ার পেছনে যতদূর জানা যায় ৬০ ভাগ দায়ী দেশের আমলাতন্ত্র আর ৪০ ভাগ দায়ী তাদের ওপর নির্ভরশীল অনভিজ্ঞ দায়িত্বহীন রাজনীতিবিদরা।


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162