আজ শুক্রবার, ১ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
 / প্রথম পাতা / এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি অপসারণ
মাসুদ শায়ান
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 9:50 PM, Count : 36
এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি অপসারণ

এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি অপসারণ

অবশেষে প্রবাসীদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেয়ান মুজিবুর রহমানকে ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গত ২৯ অক্টোবর বেসরকারি খাতের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের অনিয়মের ঘটনায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী সংসদীয় কমিটি। ওইদিন ব্যাংকটির ঋণ অনিয়মের ঘটনা শিউরে ওঠার মতো এবং আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক। সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ডিসেম্বরের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছিল কমিটি। ওই সময় আরো বলা হয়, নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়ে ১৯২ কোটি টাকা হয়েছে, যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণে নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকের পরই ব্যাংকটির অবস্থান। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১৯ কোটি টাকা। গত জুনে বেড়ে ১৭২ কোটি টাকা হয়। কার্যক্রম শুরুর কিছুদিনের মধ্যে ব্যাংকটির পরিচালকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি দেখা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ২০১৬ সালেই এনআরবিসির ৭০১ কোটি টাকা ঋণে গুরুতর অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের ২০ মার্চ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও এমডির কাছে পাঠানো পৃথক নোটিশে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে এনআরবিসি ব্যাংক চালাতে ব্যর্থ হয়েছে ফরাছত আলীর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ। আর এমডি ব্যর্থ হয়েছেন ব্যাংকটিতে যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে। এমনকি তারা গুরুতর প্রতারণা ও জালিয়াতি করেছেন, যা ফৌজদারি আইন অনুযায়ী দন্ডনীয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হতে না হতেই শুরু হয় অনিয়ম আর ভয়ংকর ঋন জালিয়াতি। ব্যাংকটির বয়স মাত্র চার বছর হয়েছে। এরই মধ্যে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন ব্যাংকের এমডি, চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা। সব জেনেও অদৃশ্য কারণে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে এতদিন নিরব থেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে অনিয়ম নিয়ে ব্যাংকটির পরিচালকদের মধ্যে ইতিমধ্যে পরস্পরকে দোষারোপের মহড়া শুরু হয়েছে। এমনকি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। শাখা খোলার জন্য ভবন ভাড়া ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, বেশি দাম দিয়ে পাইরেটেড সফটওয়্যার কেনা, যাচাই-বাছাই ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন, বহিরাগত এমনকি ঋণগ্রহীতাকে পর্ষদ সভায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া, বছরে একবারও দেশে আসেন না এমন পরিচালকদের সই জাল করা, তথ্য গোপন করে বিকল্প পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ মঞ্জুরিসহ বড় বড় অনিয়ম ঘটে গেছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে। এসব অনিয়মের সঙ্গে খোদ ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ফরাছত আলী, ভাইস চেয়ারম্যান ড. তৌফিকুর রহমান চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেয়ান মুজিবুর রহমান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডির এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা নেয়া পরিচালকরাও কোণঠাসা হয়ে পড়েন। প্রথমে যে কয়েকজন পরিচালক এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নানা হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যানের সইসহ পত্রের মাধ্যমেই এ ধরনের হয়রানি করা হচ্ছে। হয়রানির শিকার হওয়া এমন এক পরিচালক (মনোনীত) এ এম সাইদুর রহমান সম্প্রতি এ নিয়ে হাইকোর্টে মামলাও করেছেন।
আদালতে পেশ করা অভিযোগে এ এম সাইদুর রহমান জানান, দুই দফা নির্বাহী পরিষদের সভাপতি হিসেবে তৌফিকুর রহমান চৌধুরী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালক শহিদুল আহসানকে নিয়ে প্রতিটি সভা  করেছেন। শহিদুল আহসান উপস্থিত থেকে তাঁর দুটি প্রতিষ্ঠান এজি অ্যাগ্রো লি. ও বেগমগঞ্জ ফিড মিলসের নামে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছেন। ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডি মিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘন করে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা বাবদ পাঁচ কোটি ২৮ লাখ টাকা কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় অনুমোদন দেন, এতে ব্যাংকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। এ বি এম আবদুল মান্নান ও কামরুন নাহার শাফীসহ চারজন পরিচালক গত তিন বছরে একবারও বাংলাদেশে আসেনি, কিন্তু তাঁদের সই জাল করে পর্ষদ সভায় উপস্থিত দেখানো হয়েছে। কামরুন নাহার শাফীর বিরুদ্ধে অগ্রণী ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই জামানতের বিপরীতে এক পরিবারের চার সদস্যকে মোট ৮২ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করতে সহযোগিতা করেছেন ভাইস চেয়ারম্যান তৌফিকুর রহমান চৌধুরী। ওই জামানতের মূল্য পাঁচ থেকে ছয় গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে বলেই অভিযোগকারীর ধারণা। তা ছাড়া নিজ ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেয়ার বিধান না থাকার পরও পরিচালক মুনসেফ আলীর প্রতিষ্ঠান মাল্টিপ্লানের নামে ২০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান ফরাছত আলী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিক খরচ, রাজনৈতিক দলের তহবিল জোগানো এবং বিশেষ বিশেষ দফতরে টাকা দিতে হবে বলে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা তুলেছেন। এর বাইরেও তিন বছরের মধ্যে ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উদ্যোক্তা পরিচালক তমাল পারভেজ ও রফিকুল ইসলাম আরজুর কাছ থেকে ১১ লাখ ডলার করে এবং সরওয়ার জামান চৌধুরী, গোলাম রাব্বীসহ অন্য উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ ধার নিয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৩৯তম পর্ষদ সভায় উদ্যোক্তাদের দেয়া প্রিমিয়াম ও ধারের টাকার হিসাব চাওয়া হলে ফরাছত আলী অনাকাক্সিক্ষতভাবে সভা মুলতবি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে আরেকটি সভায় ওই টাকার হিসাব চাওয়া হলে চেয়ারম্যান জানান, ১৮ কোটি টাকা ভাইস চেয়ারম্যান তৌফিকুর রহমান চৌধুরীর কাছে আছে। ওই ১৮ কোটি টাকা না পেলে চেয়ারম্যানের পক্ষে প্রিমিয়ামের টাকার হিসাব দেয়া সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, তৌফিকুর রহমান ও তার ছেলের এ ব্যাংকে বিনিয়োগ ১৮ কোটি টাকা। প্রিমিয়ামের টাকার হিসাব ও ধারের টাকা ফেরত চাওয়ায় কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ তুলে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এ এম সাইদুর রহমান। বিশেষ মহলের স্বার্থে কাজ করার জন্য নির্বাহী কমিটি ভেঙে দিয়ে খুবই অল্প পরিমাণ শেয়ার রয়েছে এমন একজনকে সভাপতি করা হয়েছে। তা ছাড়া সভার আলোচ্যসূচিতে না থাকার পরও ওই সভার কার্যবিবরণীর ২৮ নম্বর আলোচ্যসূচিতে মেসার্স স্টাইলিশ গার্মেন্ট লি. নামের একটি নতুন প্রতিষ্ঠানকে ৮২ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেখিয়ে দ্রুত ৫৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ বিষয়ে অডিট করার উদ্যোগ নিলে অডিট কমিটির সভা করতে দেয়া হয়নি। উল্টো অডিট কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ এম সাইদুর রহমান জানান, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এখন মূল বিনিয়োগকারীদের পরিবর্তে বহিরাগত ও তথাকথিত প্রিমিয়ামের টাকা দিয়ে পরিচালক হওয়া ব্যক্তিদের হাতে চলে গেছে। এঁদের মূল লক্ষ্য, ব্যাংকের আমানতের টাকা বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নেয়া। অনিয়মে বাধা দেয়ার মতো যেসব পরিচালক ছিলেন তাদের নানা কৌশলে ব্যাংক থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। এতে ব্যাংকের শেয়ার গ্রহীতা ও আমানতকারীদের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ছাড়া এমডির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ থাকার পরও তাঁর চাকরির মেয়াদ তিন বছরের জন্য বাড়ানো হয়। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি ব্যাংকটি পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা মোতাবেক দেয়ান মুজিবুর রহমানকে অপসারণ করা হয়েছে। আগামী দুবছর তিনি অন্য কোনো ব্যাংকের এমডি হতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। শুভঙ্কর সাহা আরো বলেন, এখন তিনি চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে আপিল করতে পারবেন। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এমডি দেয়ান মুজিবুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখন কথা বলতে চাই না’ বলে ফোনের লাইন কেটে দেন।


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162