সোমবার, আগস্ট ২০, ২০১৮ | ৪, ভাদ্র, ১৪২৫
 / মতামত / ভাষার মাসের বাকবিলাসী কর্মবীর
করীম রেজা :
Published : Monday, 12 February, 2018 at 4:19 PM, Update: 12.02.2018 4:44:15 PM, Count : 158
ভাষার মাসের বাকবিলাসী কর্মবীর

ভাষার মাসের বাকবিলাসী কর্মবীর

আমরা বাঙালিরা আজ বেপথু! একুশে ফেব্রুয়ারি, আগুনে ফাগুন, ভাষা শহীদ দিবসের দোরগোড়ায়। বাংলার ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে তা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার প্রদীপ তুলে ধরেছে বিশ্ব নামক গ্রহের আনাচ-কানাচে।
কোনো উপলক্ষ এলেই আমরা স্মৃতিকাতর হই। প্রগলভতায় বীরত্বের ফানুস উড়াই। তারপর বিস্মরণের খেয়া ভরা পালে কোথাও অন্তর্হিত হই। যতই দিন যায় আমরা ততই বাকবিলাসী হয়ে উঠছি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- বাঙালি কর্মবীর।
১. ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা বাংলা ভাষা নিয়ে যত কথা, যত কাজ, যত ভাব- বলি, করি আর দেখাই, পরের মাসেই কিন্তু তা ভুলে যাই। সারা বছরের বাকি এগারো মাস বাংলা ভাষার প্রতি যথা সম্মান কি দেখাই? যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। এমন নজির পৃথিবীতে খুবই কম। যোদ্ধাজাতিরূপে আমাদের গৌরবের স্থানটি অতুলনীয়। ভাষার জন্য যুদ্ধ- এমন জাতিগোষ্ঠী বা জাতি রাষ্ট্র পাওয়া দুষ্কর।
২. ভাষা আন্দোলন আমাদের আত্মপরিচয়কে সুস্থির করেছে। তারপরও  ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আমাদের প্রতীক্ষা করতে হয়েছে। আত্মচেতনা কেন্দ্রীভূত করে স্বাধীনতা অর্জন করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এখনও সেই ভাষার মর্যাদা কি আমরা সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছি? আমাদের কি আরো সুদীর্ঘকালের অপেক্ষার প্রত্যাশা নিয়ে দিন গুনতে হবে?
৩. সৌদি আরবে প্রচুর ভারতীয় কর্মব্যপদেশে রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বোধ করি- কেরালা রাজ্যের মালয়ালামভাষী লোকজন। রাজ্যটি ১০০% সাক্ষর এবং শিক্ষিত বলে দাবি করে। শুনেছি ওই রাজ্যে ভাষা হিসেবে হিন্দির ব্যবহার ও প্রয়োগ প্রায় অচ্ছ্যুৎ। সাইন বোর্ডে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার ব্যবহার নেই বলা চলে। কোনো কেরালা রাজ্যের বাসিন্দাকে যদি প্রশ্ন করা যায়, সে কোন দেশ থেকে এসেছে- দ্বিধাহীন উত্তর ‘কেরালা’। নবীন বা যারা বই-পুস্তক কিংবা লোকমুখে কখনোই ‘কেরালা’ নামের কোনো দেশ পৃথিবীতে আছে বলে জানে না- তারা খুব অবাক হয়। আবার প্রশ্ন করে তবেই জানা যায়, কেরালা হচ্ছে ভারতের অংশ। অর্থাৎ এরা শুরুতেই নিজেকে ভারতীয় বলে পরিচয় দেয় না। চেন্নাই বা মাদ্রাজের লোকজনও এমনতরো আচরণই করে। প্রাচীন অস্ট্রিক সভ্যতা-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার নিয়ে খুব গর্ববোধ করে। কাবাডি বা কানামাছি জাতীয় খেলাগুলো স্বনামে অথবা ভিন্ন নামে অস্ট্রিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বহন করছে ওদের সমাজ-জীবনে। আমরাও অস্ট্রিক সংস্কৃতির ধারক। আমরা কিন্তু বাঙালি পরিচয়ে অকুণ্ঠ হতে কুণ্ঠাবোধ করি।
৪. রিয়াদের রাস্তায় বের হলেই এখানে সেখানে ট্যাকসি বা লিমুজিন দেখা যাবে। অধিকাংশ ড্রাইভার পাকিস্তানি। উর্দু হচ্ছে তাদের অধিকতর যোগযোগের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ভাষা। আরবি বা ইংরেজিতে কথাবার্তা বলে সওয়ারী হলেই অবধারিত প্রশ্নটি শুনতে হয়। কোন দেশি? বাংলাদেশি শুনলে তো লাফিয়ে উঠবে অথবা অনুযোগের স্বরে জিজ্ঞেস করবে- উর্দু জানতে নেহি? 
কিউ নেহি! কিউ নেহি! আলবৎ। আলবৎ বলতে না পারলেও আমরা বাঙালিরা প্রায়ই জান্তা হায়, কইতা হায় কিংবা পারতা হায় ইত্যাদি বলে উর্দু বলার চেষ্টা করি। আমরা ভুলে যাই এই উর্দুভাষীদের অতীত ব্যবহার বাংলার বিরুদ্ধে। ভুলে যাই যে বাংলা ভাষার গুণ-গৌরবে আমরা খুব সহজেই পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষার শব্দ নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করতে সক্ষম। আর এজন্যই আমরা চমৎকার আরবি, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি বা অন্য কোনো ভাষা অল্প আয়াসে খুব সঠিক উচ্চারণে বলতে পারি।
৫. প্রবাসী বাংলাদেশি ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় রয়েছে। রিয়াদের তেমন একটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিকী প্রকাশনার সঙ্গে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যক্রমে বক্ষ্যমাণ লেখক জড়িত ছিলেন। পূর্বেকার প্রকাশিত স্কুল ম্যাগাজিনে মুদ্রিত সব লেখা ছিল ইংরেজি ভাষায়। পরিচালনা পর্ষদকে দু-একটি পৃষ্ঠা বাংলা ভাষায় লেখা মুদ্রণের জন্য সংরক্ষণ করাতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন দেশের অনুরূপ বিদ্যালয় বার্ষিকী এবং অন্যান্য যুক্তির কারণে তারা অনুরুদ্ধ হন। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে লেখা আহ্বান করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। কয়েকজন অভিভাবকের প্রবল আপত্তির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। তাদের যুক্তি ছিল খুব সহজ, ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের বার্ষিকীতে বাংলা ভাষায় কোনো লেখা ছাপা হতে পারে না।
অভিভাবকদের একজন কোনো এক অনুষ্ঠানে আমাকে জনান্তিকে ডেকে নিয়ে বোঝালেন যেন আমি এই প্রস্তাবের পক্ষ ত্যাগ করি। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে একই অনুরোধ পাঠালেন। একদিন কোনো কাজে স্কুলে এসেছিলেন। আমার দেখা পেয়ে বেশ কিছুক্ষণ নসিহতও করেছিলেন। তবে আমি অর্বাচীন। আজও পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি। ছাত্রছাত্রীরা দু-একটি লেখা বাংলায় লিখলে কী ক্ষতি হতো! আবারও বার্ষিকী প্রকাশের উদ্যোগ চলবে। তবে  বাংলা ভাষার কোনো প্রস্তাব নিয়ে কেউ আসবে এমন দুঃস্বপ্নই থেকে যেতে বাধ্য বা যাবে।
বাঙালির গর্বের বস্তুর আকাল নেই। কিন্তু সেই গল্পের মতো অন্ধ সেজে স্বর্ণপি- এড়িয়ে যাওয়ার চর্চা মনে হচ্ছে আজ অবধি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। তাই আত্মবীক্ষণ, বাকসঞ্চালনের কারুকৃতির শিল্প-কুশলতায় সুপ্তিমগ্ন; কাল-গহ্বরে, দুয়ো রানীর সোনার কাঠি, রুপার কাঠির মায়া বলে।
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162