এই মাত্র পাওয়া :
শনিবার, জুন ২৩, ২০১৮ | ৯, আষাঢ়, ১৪২৫
 / মতামত / ৮ মার্চ নয়, প্রতিদিনই হোক নারী দিবস
দিলরুবা খান
Published : Wednesday, 7 March, 2018 at 11:54 PM, Update: 08.03.2018 12:04:49 AM, Count : 430
৮ মার্চ নয়, প্রতিদিনই হোক নারী দিবস

৮ মার্চ নয়, প্রতিদিনই হোক নারী দিবস

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ দিনটি একদিকে যেমন নারীর অধিকার আদায়ে আন্দোলন করার দিন, অন্যদিকে জগৎজুড়ে যে নারী সংগ্রাম চলছে তার প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করার দিন।

দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণী এই দিবসে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের শৃখল ভাঙার শপথ নেবে। শপথ নেবে মজুরি দাসত্ব থেকে মুক্তির, পুঁজি ও সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা উচ্ছেদের। এই দিনটি পালনের মধ্য দিয়ে সারা দুনিয়ার শ্রমিক নারীরা ঐক্যবদ্ধ হবেন ও শোষণমূলক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করবেন নারীরা। 

এ দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। আজ থেকে দেড়শ বছরেরও আগে অর্থাৎ ১৮৫৭ সালের এই দিনে নিউইয়র্কের সুচ কারখানায় নারী শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধি, কাজের সময় নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রের মান উন্নয়নের দাবিতে প্রতিবাদ করে রাস্তায় নামে। এতে তাদের ওপর নেমে আসে মালিক শ্রেণীর পুলিশি নির্যাতন। সেই অমানবিক নির্যাতন সহ্য করে তারা জেল খেটেছে। তবু মাথা নত করেনি লড়াকু নারীরা। স্তব্ধ করা যায়নি তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। এর তিন বছর পর নারীরা প্রথম শ্রমিক সংঘ প্রতিষ্ঠা করে। 

১৯০৮ সালের ৮ মার্চ ১৫ হাজার নারী নিউইয়র্ক শহরে ‘রুটি ও গোলাপ’ এই স্লোগান নিয়ে বিক্ষোভ করে। রুটি ছিল অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক এবং গোলাপ ছিল উন্নত জীবনের প্রতীক। বিশ্বে প্রথম ‘জাতীয় নারী দিবস’ পালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে  ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক পার্টির উদ্যোগে। এরপর ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনের সোশ্যালিস্ট সংগঠনগুলোর সম্মেলনে জার্মান সমাজবিদ কমিউনিস্ট নারী শ্রমিক নেত্রী  ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের প্রস্তাব করেন এবং ১৭টি দেশের ১০০ নারীসহ সবার সমর্থনে প্রস্তাব পাস হয়। এ দিনটি একদিকে যেমন নারীর অধিকার আদায়ে আন্দোলন করার দিন অন্যদিকে জগৎজুড়ে যে নারী সংগ্রাম চলছে তার প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করার দিন।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবসের মূল মর্মবাণী ছিল একসঙ্গে একযোগে নারী প্রগতির আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে সার্থকভাবেই নারীসমাজকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে আসছে। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সবদেশে দিনটি পালন করা হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ নারীর সমতা ও উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ মার্চ পালনের  ঘোষণা দেয় সব রাষ্ট্রের  প্রতি। জাতিসংঘের এ ঘোষণা ৮ মার্চকে  ঘিরে যে লক্ষ্যরেখা  টানা হয়েছিল তা কর্পূরের মতো উবে যায়। বাংলাদেশের নারীসমাজে বিশেষ সাড়া পড়ে। ৮ মার্চকে জানার আগ্রহ বাড়ে। এ দিবস পালনের জন্য সবাই উদ্যোগী হয়। 

১৯৮৫ সালে নারী দশক পূর্তি উপলক্ষে বেশ কয়েকটি নারীসংগঠন ও মহিলা পরিষদ একত্রে নারীদিবস পালন করে। এতে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘের তথ্যকেন্দ্রে কবি বেগম সুফিয়া কামালের সভানেতৃত্বে। ওইবছর ৩টি জাতীয় দৈনিকে ৮ মার্চ উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়।


বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও তৎকালীন সাধারণ সম্পাদিকা মালেকা বেগমের নেতৃত্বে  বাংলাদেশের সবজেলায় ৮ মার্চ পালনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত গয়। এ সময়ের  মধ্যে অনেক এনজিও আত্মপ্রকাশ করে নারীউন্নয়ন  বিষয় নিয়ে, নানাবিধ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে এবং ৮ মার্চ পালনের একাগ্রতা প্রকাশ করে তারা। ১৯৮৬  সালে ১৭ দফার দাবিতে  ঐক্যবদ্ধ নারীসমাজ গঠিত হয়। ঐক্যবদ্ধ নারীসমাজের সব সদস্য সংগঠন বিপুল উৎসাহ নিয়ে ৮ মার্চ পালন করে আালোচনাসভা ও মিছিলের মাধ্যমে। ১৯৯১ সালে নারীদিবস উদযাপন কমিটি গঠন করে যথাযোগ্য মর্যাদায় এদিবস পালনের প্রস্তুতি নেয়া হয়। লিফলেট প্রচার করা হয়। লিফলেটে ৪টি দাবিনামা ছিল। ১৯৯২ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবস  সম্মিলিত উদযাপন কমিটি গঠিত হয়। এসব কাজে মহিলা পরিষদই উদ্যোগী ভুমিকা পালন করে। ৫২টি এনজিও ওই কমিটির সদস্য ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কবি সুফিয়া কামালের আহবানে মহিলা পরিষদ কার্যালয়ে এই কমিটি গঠিত হয়। এতে ৫টি উপপরিষদ গঠন করে ওই বছরের  কর্মসূচি পরিচালিত হয় এবং কার্যক্রমগুলো ১৯৯২ সালে পালিত হয়েছে। বেইজিং সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির উদ্যোগে ১৯৯৪-৯৫ সালের ৮ মার্চ উদযাপন কমিটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নারীদিবস ব্যাপকভাবে পালিত হয়। এভাবেই আন্তর্জাতিক নারীদিবস বাংলাদেশের নারীদের   হৃদয়ে আসন পেতেছে। গত কয়েক বছর ধরে ৮ মার্চে রাজধানী মুখর হয়ে ওঠে। বলতে গেলে ৮মার্চ এখন নারীমুক্তির প্রতীকরূপে পালিত হয়ে আসছে বিশ্বজুড়ে। 

১৮৫৭ সালের ঘটনা কালের প্রবাহে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্ব নারী প্রগতি আন্দোলনের ফসল হিসেবে। ১৯১০ থেকে ২০০১৮ সালে এসে আমরা পৌঁছেছি। আন্তর্জাতিক নারীদিবসের আবেদনে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি এবং উত্তরোত্তর এর আবেদন আরো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ৮ মার্চ আজো বিশ্ব নারী সমাজের  আন্দোলনে, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে  প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু এতসব অগ্রগতি সত্বেও নারীরা এখনও অব্যাহতভাবে নানাধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

 নারী ও মেয়েশিশুদের  সহিংসতার  মূল কারণ অনুধাবনের ঘাটতি নারী নির্যাতন রোধের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী যে শিল্পটি , সেই গার্মেন্ট শিল্পের শতকরা ৮০ জনই নারী। তারা স্বল্প মজুরিতে তাদের শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। গামের্ন্টের নারীশ্রমিকরা ধর্ষণসহ নানারকম নির্যাতনের শিকার হয়। মালিকের কাছে বিচার চেয়েও কোনো সুরাহা হয় না। তারপর আবার প্রায়ই গার্মেন্ট কারখানায় আগুন লেগে নিহত হতে হয় বেশিরভাগ নারীকেই। বিল্ডিং ধসে মারা যাওয়া অংশের বেশিরভাগই নারীশ্রমিক। 
যেখানে ৮ মার্চের মূল বিষয় শ্রমিকের অধিকার, নারীর সম অধিকার, অথচ সেই শ্রমিকের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। খেতে-খামারেও নারীরা শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। শহরে ইট ভাঙার কাজেও অধিকাংশ নারী নিয়োজিত। ছোট ছোট সন্তানদের পাশে রেখেই তারা ইটভাঙার মতো কঠিন কাজ করে। যাচ্ছে শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে। শ্রম দিচ্ছে উদয়াস্ত খাটছে তবুও ভিক্ষা বৃত্তিতে নামেনি। পৃথিবীর মোট শ্রম শক্তির বেশিরভাগই নারী। স্বনির্ভর বা গৃহনির্ভর কাজসহ আনুষ্ঠানিক কাজেও নারীদেরই অংশগ্রহণ বেশি। তারপরও নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের চাইতে কম মজুরি পায়। এই সামাজিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি এখনো। 

বৈষম্যমূলক আর্থসামাজিক মনোভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজে নারীদের অধস্তন অবস্থানকে আরো পাকাপোক্ত করে। এতে মেয়েশিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে। আমাদের সবাইকে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। শুধু কোনো কর্তৃপক্ষের কাঁধে নারী নির্যাতনের মোকাবেলার দায় চাপিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সবাইকে তৎপর হতে হবে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের যে  ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতা তার কাছে আর প্রতিরোধহীন অসহায় আত্মসমর্পণ নয়- আসুন এর বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াই। আমাদের এৗক্যবদ্ধ প্রতিরোধে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করা একদিন ঠিকই সম্ভব হবে।
 আন্তর্জাতিক নারীদিবসে বাংলাদেশ সরকারের এ বছরের নারী দিবসের  শ্লোগান  হচ্ছে- ‘সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা,বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরে কর্ম জীবন ধারা’।   তাই  এ স্লোগানকে অর্থবহ করে করতে হলে আন্তরিকতা চাই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক  পর্যায়ে। ৮ মার্চ মানে শুধু একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বছরের সবকটি দিনকে নারীর জন্য সহিংসতা ও বৈষম্যমুক্ত করার  অঙ্গীকার করার দিনই হলো ৮ মার্চ। এ অঙ্গীকার গ্রহণ করতে হবে নারী-পুরুষ সবাইকে। 

তাই আসুন, নারী-পুরুষ সবাই মিলে সোচ্চার হই। ঐক্যবদ্ধ হই।আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর তৎপরতায় একদিন ঠিকই সম্ভব হবে বৈষম্য মুক্তসমাজ গড়া।সবশেষে আবারও বলবো, নারী দিবস আসে আবার চলেও যায় শুধু এই দিনটিতেই নারী দিবস পালনের মধ্য দিয়েই সঠিক সিদ্ধান্ত কার্যকরী নয়- আমাদের অঙ্গীকার প্রতিদিনের, প্রতি সময়ের, প্রতি মুহ‚র্তের। তাই শুধু ৮ মার্চ নয়, প্রতিদিনই হোক নারী দিবস।  সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162