বুধবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮ | ২৭, অগ্রহায়ণ, ১৪২৫
 / ফিচার / আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে
মুহাম্মদ ছমির উদ্দিন রানা, বড়লেখা, ডেসটিনি অনলাইন :
Published : Thursday, 8 March, 2018 at 6:26 PM, Update: 08.03.2018 6:30:28 PM, Count : 340
আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

বেশ কিছুদিন থেকে প্ল্যান করেই যাচ্ছি, বোবারথল যাওয়ার সময় সুযোগের অভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। হঠাৎ করে তালতো ভাই জায়েদ এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন বোবারথল সফর আয়োজন করার। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হল সবাই বড়লেখা বাজার সকাল ১০ টায় উপস্থিত থাকার। সবাই যথাসময় উপস্থিত হলেন দুই একজন বাদে। মোট সদস্য হলেন নয় জন। সবার কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে দুপুরে খাওয়ার জন্য বিরানী প্যাকেট করে নিলাম। সাথে মাত্র ২ লিটার পানি, কিছু পানি হানিফ ভাইর বাসা থেকে সংগ্রহ করি। পাহাড়ি অঞ্চলের কুয়া'র পানি বেশ সুস্বাদু। এছাড়া বহন করাও কঠিন তাই বেশি নিলাম না। সবাই বড়লেখা উত্তর বাজার থেকে বোবারথল যাবার একমাত্র বাহন জীপ না পেয়ে মুহাম্মদনগর বাজার/ছোটলেখা বাজার পর্যন্ত যাবার জন্য দুইটি লোকাল সি,এন,জি গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে আমরা ছাড়া ৪০-৪৫ বছরের একমাত্র বয়ষ্ক মহিলা আমাদের উচ্ছাস দেখে জিজ্ঞেস করলেন- বাবারা বোবাত খার বাড়ি যাইতায়?
আমরা জানালাম কারো বাড়িতে নয়, এমনিতে ঘুরতে যাচ্ছি।

-ইয়াল্লারে বাবা অখল ই ফেখ ফানি টেলিয়া অতো জাগা গিয়া হেরান অইবায়, খাইবায় কিতা? আমি এখন বাড়িত যাইতাম নায় নাইলে তুমাতানরে মাদানে খাওয়াইয়া দিলাম অনে।
আমরা বললাম- আমাদের সাথে আরও লোক আছে অন্য গাড়িতে। তাদের সাথে খাবার আছে, আমরা সবকিছু সাথে নিয়া'ই আসছি। আপনি বলছেন তাতেই আমরা বেশ খুশি হইছি।
তবুও অতা যাগা আটিয়া লয়া খানিয়ে কিতা অইব?
অবাক না হয়ে পারলাম না, একদিনের একটু পরিচয়ে কত আপন ভাবেন তারা, কত না আন্তরিক...

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

ছোটলেখা বাজার থেকে কর্দমাক্ত কাচা পথে হাটা শুরু করলাম, চা বাগানের ভেতর দিয়ে আঁকা-বাকা পথে অবিরাম চলতে থাকি আমরা। একসময় দেখা গেল আমরা চা বাগান পেরিয়ে উঁচু নিচু বেশ কয়েকটি টিলা অতিক্রম করছি। রাস্তার পাশে কলাবাগান, কখনও কাঁঠাল বাগানসহ বিভিন্ন ফল ফসলের গাছ, চারদিকে ঘন সবুজ অরন্য। যাবার পথে কাওছাইন ভাই পথিমধ্যে কতটা টিলা উটতে-নামতে হয় গুনছিলেন। কারন, এলাকার আঞ্চলিক ভাষায় একটি ডায়লগ আছে- "বারো উটনি তেরো থল, এর নাম বোবারথল" কিন্তু দুঃখের বিষয় ৭-৮ টা টিলা উঠা-নামার পর তা আর স্মৃতিতে ধারন করে রাখা সম্ভব হলনা। মজার ব্যাপার, আধা ঘন্টা চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই সবার মোবাইলের নেটওয়ার্ক বিদায় নিল। একটু পরপর আর কারো মোবাইলে রিংটোন বাজেনা। কাউকে ফোন দেয়ার জন্য মোবাইল বের করে দেখি শূন্য। রিংটোন এর ঝামেলাবিহীন সম্পূর্ন এক আলাদা জগত। তখন আমার মনে হল মসজিদে দেয়ালে টাঙ্গানো থাকে- মোবাইল ফোন বন্ধ রাখুন, নামাজ শুরু করার আগে ইমাম সাহেব বলেন- কাতার সোজা করুন, মোবাইল ফোন বন্ধ রাখুন। তবুও মাঝে মাঝে ভাইব্রেশনের আওয়াজ, রিংটোন এর আওয়াজ শুনা যায়। যদি প্রতিটা মসজিদ নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা যেত তাহলে কেউ ভুল করে ফোন বন্ধ না রাখলেও সমস্যা হত না।

ক্লান্ত হয়ে কখনও সবাই একসাথে রাস্তায় বসে বিশ্রাম নেই, আবার কিছুক্ষন পর এগিয়ে চলা। একসময় পৌঁছে গেলাম বোবারথল বাজার। ৩৫-৪০ টা দোকান মিলে একটি বাজার, দুপুর বেলা বেশিরভাগ দোকানই বন্ধ থাকে। বাজারে একটি দোকানে দেখা গেল মোবাইল এন্টিনা টাঙ্গানো। খুব সম্ভব এখানে কল সেন্টার, এখান থেকে দেশের বাইরে যোগাযোগ করা হয়। প্রচন্ড গরম ও দীর্ঘসময় হাটার কারনে সবার পরনের কাপড় ছিল ঘামে ভেজা। অন্যদিকে সবার চেহারা শুকিয়ে খুব সহজেই ফুটে উঠেছে ক্ষুধার্ত ভাব। বাজারের একটি দোকান থেকে আবার কিছু পানি, সাবান কিনে নিয়ে পুকুরের সন্ধানে পৌঁছাই ইসলামনগর জামে মসজিদ। মসজিদের পুকুরপারে বসে সবাই দুপুরের লাঞ্চ করে অনেকটা স্বাভাবিক হই। নিঃসন্দেহে এই পুকুর অনেক মূল্যবান। যেহেতু দুই ঘন্টার দীর্ঘপথে কোথাও একটি পুকুর চোখে পড়েনি। খাবার শেষ করে আমাদের ব্যবহৃত আবর্জনা মসজিদের যথাযথ স্থানে রেখে স্থানীয়দের সাথে কিছুক্ষন গল্প জুড়ি। চমৎকার গল্প। এই গ্রামে কিছু যায়গায় নেটওয়ার্ক থাকে, শীতকালে বিয়ে হয় জীপ গাড়িতে, বর্ষায় পালকিতে, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতাল নেয়া হয় বিভিন্ন কৌশলে কাধে করে।

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

সাততলা ঝর্না যাবার রাস্তার খোঁজ নিয়ে আমরা আবার চলতে থাকি। রাস্তা দেখা গরু ছাগল গরমে ঘাস না খেয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে বোবার মত। মনে প্রশ্ন জাগে, বোবারথলের গরু ছাগল বোবা নাকি? প্রচন্ড রোদে চারদিকে মাঠে কৃষক কাজ করছে, পথের পাশে বেশির ভাগ বাড়ি টিলার উপরে। বাড়ির রাস্তা মাটি কেটে সিড়ি করা, কোন কোন বাড়িতে মাটি যাতে ভেঙ্গে না যায় সে জন্য সুপারী গাছের খন্ড খন্ড অংশ দিয়ে বেশ সুন্দর করে সিড়ি তৈরি করা। প্রতিটি বাড়িতে ফল ফসলের বিপুল সমাহার- কাঁঠাল গাছ, আম গাছ, বরই গাছ, সুপারী গাছ, বিভিন্ন জাতের লেবু, আনারস, কমলা, বেল গাছ, বরই গাছ, এছাড়াও জানা অজানা হরেক রকম গাছ গাছালিতে বেষ্টিত পুরো বাড়ি। রাস্তায় দেখা প্রতিটা মানুষ স্লিম স্বাস্থ্য, অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবান কাউকেই নজরে পড়েনি। আবার মেয়েগুলো বেশ লাজুক ও রুপবতী। আঁকা-বাকা টিলার পাশ দিয়ে ছোট্ট রাস্তা দিয়ে চলার পথে এক শিশুর কাছ থেকে ঝর্নার রাস্তা জানতে চাইলে সে বলল, তার সাথে হাটার জন্য সে আমাদের নিয়ে যাবে। তাকে গাইড হিসেবে পেয়ে সবাই আরো বেশি আনন্দিত হই। এক এক করে সবাই তাকে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন, সেও আমাদের পেয়ে বেশ আগ্রহের সাথে হাসিমুখে আমাদের সবার প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছে। অপরিচিত রাস্তায়- রাস্তা অল্প হলেও বেশ দূর মনে হয়, আমাদের ক্ষেত্রেও তাই মনে হচ্ছে। একটু পর পর আমাদের টিমের একেকজন তাকে বলছেন, আর কত দূর? আর কত সময় লাগবে? সেও হাসিমাখা মুখে বলে এইতো এসে গেছেন, আর মাত্র পাচ মিনিট, এভাবে দুই তিনবার বলার পর জমির ভাই বলেন - কিরে, তর পাচ মিনিট কমে না- নাকি?

একসময় পৌঁছালাম কাঙ্খিত সাততলা ঝর্ণায়। অন্ধকার গুহার মত একটি জায়গায় সাততলা ঝর্ণার নিচের ধাপ, আমার মনে হয় একা গেলে যে কেউ ভয় পাবে। ঝর্ণার দেখা পেয়ে নিমিষেই সবার ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। সবার উচ্চ আওয়াজে মুখরিত চার পাশ, কেউ গান গাইছে, কেউ মনের সুখে অযথাই চেচিয়ে ইয়েস, ইয়েস, আই লাভ মাই বাংলাদেশ বলছে। ভাগ্য ভালো আশে পাশে কোনো ঘর বাড়ি নেই, নয়তো আমাদের চিৎকারে গ্রামের সবাই জড়ো হত। এর মধ্য থেকে কয়েকজন মিলে উপরের ধাপগুলো অতিক্রম করার চেষ্টা করি। বাকি ধাপগুলোর প্রতিটা ধাপ-ই হেব্বি রিস্কি, যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। অনেকটা জায়গা ঘুরে এক ধাপ অতিক্রম করি। এভাবেই তিন/চারটা ধাপ অতিক্রম করে সময় স্বল্পতা এবং সাপ -বিচ্ছু ভয়ের কারণে ফিরতে হল। আসার পথে আগের মত দূর মনে হল না, প্রায় ত্রিশ মিনিটের মত সময় লাগে মসজিদের পুকুরে পৌঁছাতে। সবাই মসজিদের বিশাল পুকুরে ঝাপাঝাপি করে গোসল পর্ব শেষ করে বাজারে যাই। ততক্ষণে বাজারের প্রতিটি দোকান খোলা হয়ে গেছে, মোটামুটি মানুষের সমাগম হল। প্রায় সবার দৃষ্টি ছিল আমাদের টিমের উপর, কেউ কেউ কাছে এসে জানতে চাইলেন কোথায় আসছি, কেন আসছি? বাড়ি কোথায়? আমরা বাজারে একটি হোটেলে চা খেতে খেতে তাদের সাথে গল্প করি কিছুক্ষন, চায়ের স্বাদ অসাধারণ।

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন প্রকৃতির অরণ্যে

সন্ধ্যার পূর্ব মুহূর্তে বিল পরিশোধ করে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলতে থাকি বিরতিহীন। ​

​এলাকাটা বেশ পছন্দ হল সবার। নেই কোনো ধরনের যানবাহনের শব্দ দূষন, নেই ধুলাবালুর ছড়াছড়ি। নেই হৈ চৈ, নিরব নিস্তব্ধ গ্রামে রাতে থাকতে পারলে আরো ভালো হত। রাতে থাকার জন্য আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিলনা, তবুও খুব ইচ্ছে জাগে রাতে থেকে যেতে। কিন্তু আমাদের সাথে থাকা দু একজনের বাড়িতে যেতেই হবে। এমন অবস্থায় তারা একা যেত পারবেনা। শেষ পর্যন্ত আর থাকা হলনা। যত সময় যাচ্ছে অন্ধকার পৃথিবীকে গ্রাস করছে। ঝি ঝি পোকার দখলে যাচ্ছে চারপাশ। কিছুক্ষন পরেই মনে হল একটু দূরে শিয়াল মামাদের টিম একসাথে তাদের গলার আওয়াজ প্রতিযোগিতা শুরু করে। পা যেন চলছেই না, পথ চলার শক্তি হারিয়ে গেছে, তবুও জোর করে নিয়ে যাচ্ছি। ইচ্ছে করছে পথেই শুয়ে থাকি। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে আমরা যে যার মত করে একেক গানের একেক লাইন গান গেয়ে এগিয়ে চলছি, কোথাও শিয়াল মামাদের সাথে রাস্তায় সাক্ষাৎ হয়ে যাচ্ছে, উনারা আমাদের খুব একটা গুরত্বই দিচ্ছেন না। আশে পাশে কয়েক কিলোমিটার কোনো মানুষের বসতি নেই, বুঝা গেল মানবশুন্য এই এলাকা শিয়াল মামাদের দখলে, স্বাভাবিক ভাবেই রাস্তা উনারা পারাপার হচ্ছেন। আবারো চা বাগানের ভেতর দিয়ে আঁকা-বাকা পথ চলতে চলতে লোকালয়ে পৌঁছাই। মুহাম্মদ নগর বাজার থেকে আবার সি.এন.জি করে বড়লেখা পৌঁছে সবাই আপন গন্তব্যের দিকে ছুটি....

ফিরে এলেও বারবার মন ছুটে যায় বোবারথল...।


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162