রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮ | ৮, আশ্বিন, ১৪২৫
 / রাজধানী / খোলা আকাশের নিচে ৫ হাজার পরিবার
মিরপুরে বস্তিতে আগুন
ডেসটিনি অনলাইন :
Published : Monday, 12 March, 2018 at 10:25 PM, Update: 12.03.2018 11:58:17 PM, Count : 183
খোলা আকাশের নিচে ৫ হাজার পরিবার

খোলা আকাশের নিচে ৫ হাজার পরিবার

মিরপুর ১০-এর নান্নু মার্কেটে নৈশপ্রহরীর কাজ করেন মোহাম্মদ বোরহান। তিনি তিলে তিলে সারা জীবনে যেটুকু সঞ্চয় করেছিলেন তা সব শেষ হয়ে গেছে এক রাতেই।

মিরপুরে পুড়ে যাওয়া হারুনাবাদ এলাকায় পুড়ে যাওয়া তিনটি বস্তির মধ্যে একটি বস্তিতে ৫০ বছরের বোরহান তার স্ত্রী, তিন ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। সেখানে গিয়েই কান্নারত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। ১৯ বছর ধরে এই বস্তিতে আছেন বোরহান। সাত বছর আগে সঞ্চয়ের ৮০ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ঘর কেনেন তিনি। ধাপে ধাপে কেনেন কিছু আসবাবপত্র আর নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু ঘরোয়া সরঞ্জাম। এর কিছুই বের করতে পারেননি তিনি।

রোববার দিবাগত গভীর রাতে নান্নু মার্কেটে দায়িত্ব পালনের সময় বস্তিতে আগুন লাগার খবর  পেয়ে ছুটে আসেন বোরহান। এসে দেখেন ঘরে যাওয়ার উপায় নেই। তার ছেলে মেয়েরা সবাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেঁদে চলেছে। সন্তানদের সান্তনা দেবেন কি, ডুকরে কান্না বের হয়ে আসে বোরহানেরও। আগুন নেভার পর মায়ায় পরে বস্তির মধ্যখানে ঘরটিতে যান বোরহান। সেখানে গিয়ে পুরনো দিনের কথা ভেবে আবার কাঁদতে থাকেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সব পুইড়া গেছে। কিছুই নাই। রাতে কই যামু। কী খামু, কিছুই জানি না। এই বস্তির পুড়ে যাওয়া তিন হাজার বাড়িঘরের প্রায় সবারই দশা একই রকম। সহায়তা না পেলে এই মানুষদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

এই বস্তিতেই জন্ম আবদুর রাজ্জাকের। বয়স ১৭ বছর। বাবার সঙ্গে ফুটপাতে ব্যবসা করেন। ঘরে থাকতে অসুবিধা বলে মসজিদে থাকেন। সকালে রাজ্জাককেও দেখা গেল তার পুড়ে যাওয়া ঘরে বসে বিলাপ করতে। রাজ্জাক বলেন, গত রাতে মসজিদে ঘুমাইছিলাম। তিনটার সময় এক পুলা জানায় আগুন লাগছে। তা শোনে আমি ছুইট্যা আসি। দেহি মা, ছোট বোন ঘরের বাইরে। আব্বায় পানি নিয়া রেডি, ঘরে আগুন লাগলে নিবাইব। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, এই আগুন নিবানো যাইব না। আমি জোর কইরা আব্বারে ঘরের বাইরে বাইর কইরা আনলাম। না অইলে আমার আব্বা বাঁচত না।

দুটি কক্ষ ছিল রাজ্জাকদেরও। বস্তির কিনারে হওয়ায় কিছুটা সময় পেয়েছিলেন তার মা ও বোনেরা। কাপড়চোপড় আর ছোটখাটো কিছু জিনিস তারা বাঁচাতে পেরেছিলেন এ কারণেই। কিন্তু খাট থেকে শুরু করে ঘরের বড় কোনো জিনিস বের করা যায়নি।

এখন জীবন আবার নতুন করে শুরু করতে হবে রাজ্জাকের। কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব হবে সেটা জানা নেই তার। রাজ্জাক বলেন, মেলা টেকার মামলা। কই পামু?। টেকা কই পামু-এটা কেবল রাজ্জাকের না, বস্তির সব হারা হাজার হাজার মানুষের প্রশ্ন। দুপুরে কী খাবে, রাতে কী খাবে, রাতে কোথায় ঘুমাবে? যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা করত, তারা কীভাবে টাকা পরিশোধ করবে? যারা কোনোমতে ঘর তুলেছিল, তারা কীভাবে ঘর তুলবে?- কথা বলেই বিলাপ শোনা গেল বস্তির পাশে গিয়ে।

লিমা বেগম এই বস্তিতে আছেন প্রায় ২০ ধরে। তার স্বামী মোঃ শামীম গার্ডের চাকরি করেন। অন্য অনেকের মতো লিমাও কিছু বের করতে পারেননি তার ঘর থেকে। কাঁদতে কাঁদতে লিমা বলেন, সব শেষ হয়া গেছে, সব শেষ, টেকা পয়সা নাই, কিছুই বাইর করতে পারি নাই। এহন কী হবে জানি না।

লিমার দুর্দশার খবর শুনে তাকে সান্তনা দিতে এসেছিলেন স্বজনরা। তাদের বেশভুষাই বলে দেয়, জীবন চালাতে গিয়ে সংগ্রামে তারা নিজেরাও। এই অবস্থায় তারা লিমাকে কতটা সহায়তা করতে পারবেন, সেটাও নিশ্চিত নয়।

এর মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াছ মোল্লা তাৎক্ষণিক কিছু সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। দুপুরে এবং রাতে খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে জানিয়ে মাইকিং করিয়েছেন তিনি।

আগুনে পোড়া বস্তিতে থাকতেন শাহিদা। একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তার স্বামীও পোশাক কারখানার শ্রমিক। দুই জনে মিলে কাজ করেন বলে ১১ বছরের ছেলেকে পাঠিয়েছেন বাড়িতে, দাদির কাছে।

দুজনের আয়ে সংসার চালিয়ে, বাড়িতে টাকা পাঠিয়েও কিছু সম্পদ ও নগদ টাকা জমিয়েছিলেন শাহিদা। পোশাক কারখানার ছুটির দিনও বিশ্রাম নিতেন না শাহিদা। জামা বানানোর কাজ করতে কিনেছিলেন দুটি সেলাই মেশিন। সব মিলিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। এখন জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিতে পড়েছেন তিনি। দুটো সেলাই মেশিন, ধীরে ধীরে জমানো নগদ ৯০ হাজার টাকা, গলার স্বর্ণের চেইন, দুই জোড়া কানের দুল আর আংটির কিছুই আনা হয়নি। পুরো মাসের জন্য যে বাজার করা হয়েছিল, তারও কিছুই বাঁচানো যায়নি।

ঘরহারা শাহিদার আশ্রয় হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার নির্মাণাধীন মোল্লা মার্কেটে। সেখানে গিয়ে উদাস দৃষ্টিতে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। চোখের কোনে টলমল করছে পানি। কিছু জিজ্ঞেস করলেই বের হয়ে আসে পানির ধারা।

শাহিদা বলেন, খালি জানডা নিয়া ঘর থেইক্যা বার হইছি ভাই। কিছুই আনতে পারি নাই। এখানে কতদিন থাকবেন- এমন প্রশ্ন পাল্টা প্রশ্ন আসে শাহিদার। এখন কই যামু? কোনো কাপড়চোপড় নাই, ভাত রান্না করার জিনিসপত্রও নাই, ঢাকায় কোনো আত্মীয়স্বজনও নাই, চক্ষে পুরাই অন্ধকার।

এই বস্তির পুড়ে যাওয়া প্রায় তিন হাজার ঘরের সব বাসিন্দাদের জীবন যুদ্ধের কাহিনি মোটামুটি একই রকম। কেউ কাজ করেন পোশাক কারখানায়, কেউ বাসা বাড়িতে, কেউ দোকানে, কেউ মার্কেটে শ্রমিকের কাজ করতেন। আর সবাই তিল তিল করে টাকা সঞ্চয় করে ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াইয়ে ছিলেন।

কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে আগুন। আগুনে ঘরের পাশাপাশি পুড়ে ছাই হয়ে যায় এত বছরের জমানো সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যত।

শরিফার বাড়ি নেত্রকোণার মদন উপজেলায়। একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন তিনি। স্বামী কাজ করেন দারোয়ানের। সংসারের অভাব ঘুচাতে তাদের পাশাপাশি দুটি ছেলেকেও দোকানে কাজ দিয়েছেন। সব সম্পদ হারিয়ে মোল্লা মার্কেটে আশ্রয় হয়েছে শরিফা ও তার পরিবারের। দুপুর ও রাতে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা। ৩০ কেজি চাল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আর্থিক সহায়তা দেয়ার কথাও বলে গেছেন একজন কর্মকর্তা।

শরিফা বলেন, সব টেহা পয়সা পুইড়া গেছে। চাউল রাইন্দা যে খাইবাম, হাড়ি পাতিল নাই, চুলা নাই। কিনবাম যে টেহা পয়সা নাই ঘর তুলবাম কেমনে?

মোল্লা মার্কেটের নিচে কথা হলো মোহাম্মদ বারেকের সঙ্গে। তার বোন হাজেরা এই বস্তিতেই থাকেন। তার স্বামী মারা গেছেন, বাড়ি পিরোজপুর। ছোট ছোট দুই ছেলে নিয়ে একটি ঘরে থাকতেন হাজেরা। সংসার চালানোর খরচ জোগাতে কাজ করতেন বাসা বাড়িতে। কোনোমতে তিন বেলা খাবার জুটত তাদের। এই আগুন দরিদ্র এই নারীকে করে তুলেছে আরো নিঃস্ব। আগুন লাগার পর এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়েছেন হাজেরা আর তার সন্তান। এক কাপড়ে কয়দিন থাকা যায়?- এমন প্রশ্নের জবাব দেয়া কঠিন।

আমরা তো বড় মানুষ, কষ্ট কইরা অভ্যাস আছে। ভাইগনা দুইটারে থামাই কেমনে কন? হেরা তো খালি কান্দে’-বারেকের মতো এমন প্রশ্ন এখন শত শত মানুষের।

এদিকে আগুনে মিরপুর ১২ নম্বরের বস্তির ৫ হাজার ঘর পুড়ে ছাই হয়েছে। এ কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস আলী মোল্লা। তিনি জানান, বস্তির প্রায় সব ঘর আগুনে পুড়ে গেছে। এসব ঘরে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি মানুষ থাকতো। আগুন লাগার কারণ এখনো জানা যায়নি। বস্তিবাসীর দাবি, নাশকতা করে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তবে ইলিয়াস মোল্লার দাবি, এটা নাশকতা নয়, দুর্ঘটনা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিরপুর ১২ নম্বরের প্রায় ৭ বিঘা জমির ওপর চারটি বস্তি ছিল। এগুলো হলো, হারুনাবাদ, কবির মোল্লা, সাত্তার মোল্লা ও নাগর আলী মাতব্বর বস্তি। মূলত এমপি ইলিয়াস মোল্লার বাবা-চাচাদের জমিতে ৭৬ সাল থেকে এই বস্তি গড়ে ওঠে। ৩৫ বছরের পুরনো এ চার বস্তিতে ৫০০০ হাজার ঘর ছিল। এখানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস করত।

ইলিয়াস মোল্লা বলেন, আমার একটি নির্মাণাধীন মার্কেটের সাতটি ফ্লোরে যাদের ঘর পুড়েছে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে ততক্ষণ তারা এখানে থাকবে। আমি তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করব।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যারা এই বস্তিতে আগে এসেছেন, তারা অনেকেরই একাধিক ঘর আছে। প্রত্যেকের গড়ে ৮/১০টি ঘর আছে। বাঁশ, টিন, কাঠ ও কংক্রিটের খুঁটি দিয়ে ঘরগুলো তৈরি। নিজেরা থাকার পাশাপাশি বাকি ঘর তারা ভাড়া দেয়। বস্তির জমির মালিকরা সেই ভাড়ার টাকার একটা অংশ পায় বলে দাবি করেছেন বস্তিবাসীরা। তবে জমির মালিকদের মধ্যে একজন এমপি ইলয়াস মোল্লা তা অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা টাকা পয়সা নেই না। এরা এমনিতেই থাকে। তারা কেবল পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল দেয়। তাও যারা সংযোগ এনে দিয়েছে তাদের কাছে দেয়।

এদিকে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) শাহিদুজ্জামান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরিতে আমাদের কর্মীরা কাজ করছেন। তালিকার পর প্রত্যেক পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হবে। এছাড়াও ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে ঘরহারা মানুষগুলোকে খাবার দেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ ঘরের ছাই সরিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্রগুলো আছে কি না তা দেখছেন।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, গত রোববার দিবাগত রাত ৪টার দিকে আগুন লাগে ইলিয়াস আলী বস্তিতে। আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বস্তিতে। বস্তির বেশির ভাগ লোক গার্মেন্টসে কাজ করেন। তাই প্রায় সবার ঘরেই ঝুট এবং প্রচুর পরিমাণে দাহ্য বস্তু ছিল। ফলে আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করে সোমবার সকাল ৭টা ২২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।



দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162