সোমবার, জুন ২৫, ২০১৮ | ১০, আষাঢ়, ১৪২৫
 / প্রথম পাতা / বিধ্বস্ত বিমানের তদন্ত শুরু
মাসুদ শায়ান
Published : Wednesday, 14 March, 2018 at 9:40 PM, Count : 62
বিধ্বস্ত বিমানের তদন্ত শুরু

বিধ্বস্ত বিমানের তদন্ত শুরু


* আহতদের না দেখেই হোটেলে বিমানমন্ত্রী
 * মৃতদেহ শনাক্তই বড় চ্যালেঞ্জ : সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান
 * অডিও ফাঁসে সরিয়ে দেয়া হলো ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ৬ কর্মকর্তাকে
 * বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় বিশ্বনেতাদের শোক

ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের সংগৃহীত ডেটা রেকর্ডার নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক এ তথ্য জানিয়েছেন।
রয়টার্সের খবরে জানানো হয়, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কানাডার বোমবারডিয়ার বলেছে, তারা তদন্তের কাজে নেপালে একটি দল পাঠাচ্ছে। বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেত্রি বলেন, ধ্বংসাবশেষ থেকে ডেটা রেকর্ডার উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা সেটি নিরাপদে রেখেছি। ডেটা রেকর্ডার নিয়ে তদন্তের পর এ নিয়ে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে। এদিকে ইউএস-বাংলার এই উড়োজাহাজ ছিল বোমবারডিয়ার কিউ-৪০০ সিরিজের।
নেপালে ১৯৯২ সালের পর এটাই বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা। ওই বছর পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বিমান দুর্ঘটনায় ১৬৭ জন নিহত হন। বিধ্বস্ত হওয়ার পর নেপালের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বিমান সংস্থাটি একে অপরকে দায়ী করছে।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তস্থল পরিদর্শন করতে নেপালে গেছেন বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাজাহান কামাল। বেলা চারটায় দূর থেকে ঘটনাস্থল দেখে তিনি কাঠমান্ডুর ইয়ক অ্যান্ড ইয়েপি হোটেলে গিয়ে উঠেছেন বলে জানা গেছে। টেলিফোনে তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন কাঠমান্ডুস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান।
বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাজাহান কামাল কি কারণে জীবিত চিকিৎসাধীনদের না দেখে হোটেলে গিয়ে উঠেছেন সেটা জানা না গেলেও এ নিয়ে চলছে সমালোচনা। মন্ত্রীর এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আহত-নিহতদের স্বজনরা। নেপালে বসবাসরত বাংলাদেশি আশরাফুর ইসলাম বলেন, এ কেমন মন্ত্রী! এসেছেন যাদের জন্য, তাদের কাছে না গিয়ে আগে গিয়ে উঠেছেন তারকা হোটেলে। তিনি কি নেপাল ভ্রমণে এসেছেন।
জানা গেছে, নেপালে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত জানতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামালের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল কাঠমান্ডু পৌঁছেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের পর তারা কাঠমান্ডু পৌঁছান বলে জানিয়েছে নেপালি সংবাদমাধ্যম হিমালয়ান টাইমস। মন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিচালনা ও পরিকল্পনা সদস্য এয়ার কমোডর মোস্তাফিজুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। দুর্ঘটনা পরবর্তী সার্বিক বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করবেন তারা।
গতকাল ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র প্রেমনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলটি পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলটিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এ দলটির সঙ্গে নিহতদের স্বজনরাও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রেমনাথ। নেপালের স্থানীয় সময় ১২ মার্চ দুপুর ২টা ১৮ মিনিটের দিকে ৭১ আরোহী নিয়ে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহতদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে।
গতকাল নেপালের সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিমানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নেপালের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। তারা আমাদের দুর্ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন। আগামীকাল সকাল ৮টায় নেপালের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবো। বেলা ১২ টায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাদগা প্রসাদ শর্মা অলির সঙ্গে বৈঠক করাব। এরপর দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবেন বলেও জানান বিমানমন্ত্রী। কি কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে তা জানতে পেরেছেন কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তারা পরস্পরকে দোষারোপ করছে। বিমানটির ব্ল্যাকবক্স ও ককপিট ভয়েস রিকোভার করা হয়েছে। তারা তদন্ত করছে। আমাদের দলও তদন্ত করছে। সন্ধ্যার পর বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের দেখতে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজে যান বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল।

সরিয়ে দেয়া হলো ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ৬ কর্মকর্তাকে
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছয় কর্মকর্তাকে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের (এটিসি) কার্যালয় থেকে বদলি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এ ছয় কর্মকর্তার মানসিক আঘাত প্রশমনে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির ইংরেজি দৈনিক মাই রিপাব্লিকা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে সোমবার ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দুর্ঘটনায় পড়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিএস-২১১। বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ারের দেয়া ভুল অবতরণ বার্তার জেরে আকাশে অপেক্ষা করতে থাকে বিমানটি। পরে ৬৭ যাত্রী ও চার ক্রুসহ দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বিমানটি বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এতে পাইলটসহ ৫০ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে। বিমানটির অপর ২১ আরোহী বর্তমানে রাজধানী কাঠমান্ডুর কেএমসি হাসপাতাল, নরভিক হাসপাতাল ও ওএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিমান বিধ্বস্তে বেঁচে যাওয়া ১০ বাংলাদেশির মধ্যে তিন থেকে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ত্রিভুবন বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক রাজকুমার ছেত্রি। নেপালের বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের উপ-মহাপরিচালক রাজন পোখারেল বলেছেন, নির্মম ঘটনার পর মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে এটাই মানসম্মত পদ্ধতি। তারা বিশাল একটি দুর্যোগের স্বাক্ষী এবং বিস্মিত। এমন অবস্থায় দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক চাপ কমাতে আমরা তাদের অন্য বিভাগে বদলি করেছি। তবে বিধ্বস্ত বিমানের পাইলট ও এটিসি টাওয়ারের কর্মকর্তাদের সর্বশেষ কথোপকথনের অডিও রেকর্ড ফাঁসের সঙ্গে তাদের বদলির সম্পর্ক নেই বলে পরিষ্কার করেছেন তিনি। এদিকে বিধ্বস্ত বিমানের পাইলটকে বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে অবতরণের ভুল নির্দেশনা দেয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে ঘটনার পরপরই। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে বিমানের পাইলটের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ কথোপকথনে এমন আভাস মেলে। নেপালের ইংরেজি দৈনিক নেপালি টাইমস কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের সর্বশেষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড হাতে পেয়েছে। নেপালি এ দৈনিক বলছে, কন্ট্রোল রুম থেকে ভুল বার্তা দেয়ার কারণেই ককপিটে দ্বিধায় পড়েন পাইলট। অডিও রেকর্ডের শুরুতে শোনা যায়, কন্ট্রোল রুম থেকে বিমানের পাইলটকে বিমানবন্দরের ডানদিকের দুই নাম্বার রানওয়েতে অবতরণের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। পরে পাইলট বলেন, ঠিক আছে স্যার। নির্দেশনা অনুযায়ী পাইলট বিমানটি বিমানবন্দরের ডানদিকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান কন্ট্রোল রুমে।
কিন্তু ডানদিকে রানওয়ে ফ্রি না থাকায় তিনি আবারো কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তাকে ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এবারে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি বর্তমান অবস্থানে থাকতে পারবেন? এ সময় পাইলট দুই নাম্বার রানওয়ে প্রি করার জন্য কন্ট্রোল রুমের কাছে অনুরোধ জানান। কিন্তু তাকে আবারো ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর পাইলট বলেন, স্যার আমি আবারো অনুরোধ করছি রানওয়ে ক্লিয়ার করুন। এর পরপরই বিমানটি বিকট শব্দ করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই বিমানটি ত্রিভুবন বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়ে।

মৃতদেহ শনাক্তই বড় চ্যালেঞ্জ : সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান
নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৫০ জনের প্রাণহানি বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান বলেছেন, আর্মি, নেভি ও এয়ার ফোর্সের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কোনো প্রয়োজন হলে তারা সাহায্য করবে। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মৃতদেহ শনাক্ত করা। অনেকে দেশের যাত্রী সেখানে ছিল, শনাক্ত করা দরকার যাত্রী কোনো দেশের। তিনি আরো বলেন, ইউএস-বাংলা স্বজনদের নেপালে নিয়ে গিয়ে কাজটি ভালো করেছে। যাত্রী ও উড়োজাহাজের বীমা রয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দুর্ঘটনা তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে, তা নির্দিষ্ট করা বলা মুশকিল। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। নেপাল টাওয়ারের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের রেকর্ড প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, আমিও ইউটিউব থেকে শুনেছি। কিন্তু এগুলো ভেরিফাইড না। আমরা এনালাইসিস করছি। এখনই মন্তব্য করা যাবে না। আমাদের একটা তদন্ত কমিটি আছে, যদিও তদন্ত কমিটি বলা যাবে না। নেপালের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো। মূল কাজটি করবে নেপাল। ব্ল্যাকবক্সের তথ্য উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হলে তা তথ্য উদ্ধার করতে পারবে। তখন অনেক তথ্য বের হয়ে আসবে। কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। তবে কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে এটা বলা মুশকিল। তবে রিজন বের করব, যাতে এর রিপিটিশন না হয়। তিনি আরো বলেন, এ ধরনের ঘটনার পর দুটি পার্ট আছে, এক হলো তদন্ত, আরেকটি হলো হতাহতদের দ্রুত উদ্ধার ও মৃতদের দেহ শনাক্ত করা। তদন্তের পার্টে, আমরা তদন্ত করছি না, কারণ আমাদের এখতিয়ার নেই। নেপালের প্রাক্তন সচিবের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি একটি টিম নেপালে পাঠিয়েছি। এটা চলমান প্রক্রিয়া। উড়োজাহাজটির কোনো ক্রটি ছিল কি-না এ প্রসঙ্গে নাইম হাসান বলেন, সিভিল এভিয়েশনের সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো উড়োজাহাজ চলতে পারবে না। এই উড়োজাহাজটি নেপালে যাওয়ার আগেও একটি ফ্লাইট করে আসছে। আমরা অনেক সময় টেস্ট ফ্লাইট দেয়, উড়োজাহাজ ঠিক আছে কি-না চেক করা হয়। ওইদিন সকালে একবার ও পরে দুপুরে একবার উড়োজাহজটি গিয়েছিল ফ্লাইটে। অতএব উড়োজাহাজটি ভালো ছিল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। উড়োজাহাজের প্রত্যেক তথ্য আমাদের ফ্লাইট সেফটি বিভাগে থাকবে। একটি বিষয় হচ্ছে বিমান কখনো পুরান হয়নি। উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের লাইফ সার্কেল রয়েছে। লাইফ সার্কেল শেষ হলে ইঞ্জিন পরিবর্তন করলেই হয়।

বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় বিশ্বনেতাদের শোক
নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় শোক জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন তারা। ১২ মার্চ (সোমবার) ৭১ আরোহী নিয়ে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে। সোমবারের এ ভয়াবহ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় একের পর এক বিশ্বনেতা তাদের শোক জানিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছেন-রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হালিমা ইয়াকোব, দেশটির প্রধানমন্ত্রী লী সেইন লুং এবং কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল-আহমদ আল-জাবের আল-সাবাহ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকেও শোক জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি শোকবার্তা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানায় ক্রেমলিন ওয়েবসাইটে ওই শোক বার্তাটি প্রকাশ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরে বাংলাদেশি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক জানাচ্ছি। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমার সমবেদনা ও শোক কাটিয়ে ওঠার কামনা জানিয়ে দেওয়া বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গভীর বেদনা প্রকাশ করে সোমবার একটি টুইট করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি লিখেছেন, কাঠমান্ডুতে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় গভীরভাবে বেদনা বোধ করছি। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমব্যথা জানাচ্ছি এবং আশা করছি, আহতরা দ্রুত সেরে উঠবেন। টুইটারে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধীও। তিনি লিখেছেন, নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক জানাচ্ছি। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হালিমা ইয়াকোব। সেখানে হালিমা লিখেছেন, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি ‘গভীরভাবে মর্মাহত’ হয়েছেন। এ মর্মান্তিক ঘটনায় যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের প্রতি সিঙ্গাপুরের জনগণের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানান হালিমা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আলাদা করে বিবৃতি পাঠিয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সেইন লুং। বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন তিনি। লুং লিখেছেন, সিঙ্গাপুর সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের প্রতি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক জানাচ্ছি। এ শোকাতুর সময়ে আমরা তাদের পাশে আছি। নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একজন মুখপাত্র বলেন,‘ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল-আহমদ আল-জাবের আল-সাবাহ। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে পাঠানো এক তার বার্তায় তিনি শোক প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছে কুয়েতি বার্তা সংস্থা কুনা। বার্তা সংস্থাটি জানায়, শো প্রকাশের পাশাপাশি আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন বলেও আশা প্রকাশ করেছেন কুয়েতি আমির।     

আতঙ্কের নাম ড্যাশ-৮
বিশ্বজুড়ে আকাশ পথে আতংকের নাম ড্যাস-৮। নেপালে ইউএস বাংলার যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেটি কানাডার বোম্বাডিয়ার কোম্পানির তৈরি ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ মডেলের। আকাশপথে বিশ্বের বিভিন্ন রুটে এই উড়োজাহাজ চলাচল করে। তবে এই মডেলের বিমানের বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই বিমান দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে। নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার বিমানটি ১৬ বছরের পুরাতন।

ড্যাশ-৭ ও ড্যাশ-৮-এর যত বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা
১৯৮২ সালে ৯ মে ইয়েমেনের এডেনের কাছেই এই মডেলের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাগরে পড়ে যায় বিমানটি। এতে ২১ যাত্রী ও ২ ক্রু প্রাণ হারান। এর ছয় বছর পর নরওয়েতে আবারও ড্যাশ সেভেন মডেলের বিমান দুর্ঘটনা কবলিত হয়। এতে ৩৬ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ-৮ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে ১৯৮৭ সালে। সে বছরের ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে যাওয়ার পথে ইঞ্জিন বিস্ফোরিত হয় বিমানটির। আগুন লেগে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। তবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল যাত্রী ও ক্রুদের। গুরুতর আহত হয়েছিলেন চারজন। একবছর বছরপরই আবারও দুর্ঘটনায় পড়ে এই মডেলের বিমান। যাত্রাপথ এবারও একই। হাইড্রলিক সিস্টেমে আগুন ধরে যায়। সৌভাগ্যবশত সেবারও যাত্রীরা বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন চারজন। এরপর ১৯৯০ সালে ব্যাংকক এয়ারওয়েজের একটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে। ব্যাংকক থেকে কো সামুই দ্বীপে যাচ্ছিল বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ এইট মডেলের বিমানটি। তবে ভারী বর্ষণের এলাকায় গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন পাইলট। এরপর একটি নারিকেল গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। নিহত হন ৩৩ জন যাত্রী ও পাঁচজন ক্রু। ১৯৯৩ সালের ৬ জানুয়ারি প্রান্সের প্যারিসে ড্যাশ-৮ বিমান বিধ্বস্ত হয়। জার্মানির ব্রিমেন বিমান বন্দর থেকে বিমানটি ১৯ যাত্রী নিয়ে আসছিল। বিমানে চারজন ক্রু ছিলেন। প্যারিস বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে পরিবর্তন করতে বলা হলে পাইলট তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে চার ক্রু গুরুতর আহত হন। ১৯ যাত্রীর মধ্যে চারজন নিহত হন। ১৯৯৫ সালের ৯ জুন নিউজিল্যান্ডে ড্যাশ-৮ এর আরও একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে তিনজন ক্রু এবং ১৮ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনায় একজন ক্রু ও চারজন যাত্রী মারা যান। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নিউইয়ার্কের বাফেলোর কাছাকাছি ড্যাশ-৮ বিমান বিধ্বস্ত হয়। বাফেলো বিমানবন্দর থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে একটি বাড়ির ওপরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং বিমানটিও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিমানে থাকা ৪৫ যাত্রী ও চার ক্রু নিহত হন। সোমবার (১২ মার্চ) নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ইউএস-বাংলার বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানের ৫০ আরোহীর প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে নেপালের সেনাসূত্র। ৯ জনের নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে তারা। নেপাল টাইমস এর খবরে বলা হয়েছে, ৭৮ জনকে ধারণে সক্ষম ওই বিমানে চার ক্রু ও ৬৭ যাত্রী মিলে ৭১ জন আরোহী ছিল। বিমানের ৩২ আরোহী বাংলাদেশি,  ৩৩ জন নেপালি,  ১জন চীনা ও ১ জন মালদ্বীপের।


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162