এই মাত্র পাওয়া : * নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে চলতে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আ‘লীগ-বিএনপিসহ ৪ মেয়র প্রার্থীকে ইসির সতর্কতা ।* সরকারি চাকুরিতে ৩০ শতাংশ কোটা বহালের দাবি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের।* কারাগারে বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে দায় সরকারের : মির্জা ফখরুল* উত্তর কোরিয়ায় সব ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা।* রাজধানীর বাস-মিনিবাসগুলোর মধ্যে ৮৭ ভাগই পরিবহন নৈরাজ্যে জড়িত।* কমন ওয়েলথ জোটকে কার্যকর করতে সংস্কারের আহবান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
রবিবার, এপ্রিল ২২, ২০১৮ | ৮, বৈশাখ, ১৪২৫
 / ফিচার / ঘুরে আসুন ঐতিহাসিক মালেকা বানুর দেশে
শিব্বির আহমদ রানা (বাঁশখালী) চট্টগ্রাম:ডেসটিনি অনলাইন :
Published : Monday, 16 April, 2018 at 7:19 PM, Count : 203
সংস্কারের অভাবে সৌন্দর্য হারাতে বসেছে শত বছরে মালেকা বানুর মসজিদটি।

সংস্কারের অভাবে সৌন্দর্য হারাতে বসেছে শত বছরে মালেকা বানুর মসজিদটি।

"মালকা বানুর দেশেরে, বিয়ার বাইদ্য আল্লা বাজেরে। মালকা বানুর সাতও ভাই, অভাইগ্যা মনু মিয়ার কেহ নাই। মালকা বানুর বিয়া হইবো, মনু মিয়ার সাথেরে।" গানটি আমাদের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে মালেকাবানু ও মনুমিয়ার প্রেমের উপাখ্যান হিসেবে। এই প্রেমকাহিনী তখন সারাদেশময় আলোড়ন তুলেছিলো। তাদের প্রেম উপাখ্যান কোনো রূপকথার গল্প নয়, মালেকা বানু-মনু মিয়ার প্রেম উপাখ্যান ছিল বাস্তবভিত্তিক প্রেম কাহিনী। লোককথার সেই মালেকা বানু ও মনুমিয়ার গল্প ও যাত্রাপালার সাথে আমাদের আজকের প্রজন্মের পরিচিতি নাও থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মূল শিকড় এবং একেবারে নিজস্ব গৌরবের বিষয় হলো আমাদের লোক সাহিত্য। কারণ এমন সমৃদ্ধ, জীবনমূখী ও পুরনো লোকসাহিত্য পৃথিবীর কোনো জাতির নেই।সেই আমাদের লোকসাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে মালেকাবানু ও মনুমিয়ার প্রেমের উপাখ্যানে। স্থানীয় মুরব্বীদের কাছ থেকে শুনা এই প্রেমকাহিনী তখন সারাদেশময় আলোড়ন তুলেছিলো। চট্টগ্রামের মালেকা বানু-মনু মিয়ার প্রেম উপখ্যান ইতিমধ্যে লোকগাথা, যাত্রাপালা, মঞ্চনাটক ও পূর্নদৈর্ঘ্য চলচিত্রেও নির্মিত হয়েছে। তাদের প্রেম উপাখ্যান কোনো রূপকথার গল্প নয়,  মালেকা বানু মনু মিয়ার প্রেম উপাখ্যান ছিল বাস্তবভিত্তিক প্রেম কাহিনী। জনশ্রুতি আছে মালেকা বানু ও মনুমিয়ার বিয়ে হয়েছিলো খুব ঝাঁকজমকপূর্ণভাবে এবং ঐতিহাসিক। জানা যায়, একমাস ধরে চলেছিলো তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। আর সেই বিয়েতে বিভিন্ন স্থান থেকে শিল্পীরা এসে গান পরিবেশন করেছেন। তারমধ্যে এই গানটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এমনকি এখনো গ্রামে-গঞ্জে গানটি বেশ লোকপ্রিয়।
বিলুপ্তির পথে ঐতিহাসিক মালেকা বানুর দিঘী এখন লবণের মাঠ ও মাছের ঘের।

বিলুপ্তির পথে ঐতিহাসিক মালেকা বানুর দিঘী এখন লবণের মাঠ ও মাছের ঘের।



ঐতিহাসিক মনুমিয়া-মালেকা বানুর নায়িকা চরিত্রে মালেকাবানু চৌধুরীর জন্মস্থান চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়নে। বর্তমানে মালেকাবানু-মনুমিয়ার প্রেম উপাখ্যানের কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়েনে অবস্থিত মালেকা বানুর মসজিদটি। কথিত থাকে যে, এখানে বিশাল একটা দিঘী ছিলো এককালে। কিন্তু কালের আবর্তে দিঘীটা আজ আর নেই। পুরো দিঘীটাই এখন লবণের মাঠ ও মাছের ঘেরে হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক চোখের পথ ছিল এই মালেকাবানুর দিঘীটা। দীঘির পশ্চিম পাশে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে মালকাবানুর মসজিদটিই এখন স্মৃতির স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদের দেওয়ালে পূর্ব পাশে খোদাইকৃত একটি পলকে মালকাবানু চৌধুরী মসজিদের সংক্ষিপ্ত লিপিবদ্ধ ছিল- " মোগল শাসনামলের শেষ দিকে জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরী এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী মালেকা বানু চৌধুরীর পিতা। মালেকা বানু চৌধুরীর ছোট ভাইয়ের বংশধর মরহুম ফৌজুল কবির চৌধুরী। ১৩৮৪ বাংলা এবং ইংরেজী ১৯৭৮ সালে মসজিদটি প্রথম সংস্কার করেন। সর্বশেষ চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও এর শ্রীবৃদ্ধি করনে বাংলা ১৪১৭ এবং ইংরেজী ২০১০ সালে মসজিদটিতে টালি সংযোজন সংস্কার করেন। বর্তমানে মরহুম ফৌজুল কবির চৌধুরীর বংশধরগণ মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করছেন"। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মালেকা বানুর পিতা আমির মোহাম্মদ চৌধুরী  ছিলেন তৎকালের প্রভাবশালী জমিদার। তার আট সন্তানের মধ্যে একমাত্র কন্যা মালেকা বানু চৌধুরী। তার বাবার জিবদ্দশায় মালেকা বানু বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন চট্টগ্রামের আনোয়ারার আরেক জমিদার পুত্র মনু মিয়ার সাথে। তাদের এই বিবাহের পূর্বে মিলন-বিরহের ঘনঘটা পূর্ণ কাহিনী ছিলো। মালেকা বানুর সাত ভাই আর মনুমিয়ার গল্প সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে যাত্রাপালার মাধ্যমে। এক পর্যায়ে মালেকাবানু-মনুমিয়ার প্রেমের ইতিহাস লোককাহিনীর রুপ লাভ করে।


মনুমিয়া-মালেকাবানুর প্রেমকাহিনী: ইতিহাসের রজকিনী-চন্ডিদাশ, শিরিন-ফারহাদ এদের প্রেমকাহিনী সম্পর্কে আমাদের প্রজন্মের অজানা নয়। ঐতিহাসিক প্রেমের আরেক নিদর্শন মালেকা বানু- মনুমিয়ার প্রেমকাহিনী। মনুমিয়া জমিদার বংশের পুত্র হলেও মালেকা বানু ছিলেন বাঁশখালী থানার সরলা গ্রামের বিখ্যাত এক সওদাগর আমির মোহাম্মদ এর কন্যা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মালেকা বানুর পিতা আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর আট সন্তানের মধ্যে একমাত্র কন্যা মালেকা বানু চৌধুরী। মনুমিয়া একদিন পাইক পেয়াদা সঙ্গে নিয়ে জমিদারি তদারকিতে বাঁশখালীর সরলা গ্রামের সওদাগর বাড়িতে পৌঁছে সাময়িক বিশ্রাম নেন। এ সময় মনুমিয়ার নজরে পড়ে সু-নয়না অপূর্ব সুন্দরী সওদাগর কন্যা মালেকা বানু। মালেকা বানু তখন কাজির মক্তবে অধ্যয়নরত। ওখানেই মনুমিয়া এবং মালকা বানুর আঁখির মিলন ঘটে। তখন থেকেই মালেকা বানুর প্রেমে পড়েন মনুমিয়া। এরপর প্রেমের টানে মনু বারবার ছুটে যেতেন মালকা বানুর বাড়িতে। অবশেষে কাজির মাধ্যমে মালেকার বাবার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন মনু। মালেকার বাবা সওদাগর রাজি হলেও বিয়েতে মালেকা রাজি ছিলেন না। কারণ হিসেবে মালেকা মনুকে বলেছিলেন- সাম্পানযোগে নদী পার হতে তার ভয় করে। কারণ শঙ্খ নদীর এপারে মনুমিয়ার বাড়ি ওপারে মালেকার। কাজেই বধূ সেজে মনুমিয়ার বাড়ি যেতে হলে উত্তাল শঙ্খনদী পাড়ি দিতে হবে। মালেকার মুখে এ কথা শুনে মনুমিয়া স্থির করলেন শঙ্খের বুকে বাঁধ নির্মাণ করবেন। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। মনু মিয়া শঙ্খ নদীর বুকে নির্মাণ করলেন বিশাল এক বাঁধ। তারপর বধূ সাজিয়ে সড়কপথে মনুর রাজপ্রাসাদে এনে তুললেন প্রিয়তমা মালেকাকে। জনশ্রুতি আছে মালেকা বানু ও মনুমিয়ার বিয়ে হয়েছিলো খুব ঝাঁকজমক পূর্ণভাবে। একমাস ধরে চলেছিলো তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। তাদের সংসারে এক কন্যা সন্তানের জম্ম হলে মালেকা বানু স্বামীর সাথে অভিমান করে পিতৃবাড়ি বাঁশখালীর সরলে চলে আসেন।
 মালেকা বানুর মসজিদে লেখকের পরিদর্শন।

মালেকা বানুর মসজিদে লেখকের পরিদর্শন।


মালেকা বানুর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ: সাত পুত্র সন্তান ও এক কন্যার জনক আমির মোহাম্মদের আদরের একমাত্র দুলারী মালেকা বানুর বিয়ের পর নিঃসঙ্গ পিতা, কন্যার স্মরণে বাঁশখালীর সরলে নির্মান করেন একটি মসজিদ ও দিঘী। যা ইতিহাসে মালেকা বানুর মসজিদ ও দিঘী নামে পরিচিত। মসজিদে ফরাসি ভাষায় একটি শিলালিপি ছিল এমন তথ্য থাকলেও বর্তমানে তা আর নেই। জনশ্রুতিতে জানা যায়, পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন দূর্যোগে বিলীন হয়ে যায় ফরাসী ভাষায় লিপিবদ্ধ শিলালিপিটি। শত শত বছরের প্রাচীন ইতিহাসের স্মৃতিবহ মসজিদটির প্রকৃত তথ্য জানা এখনও সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিশাল দীঘিটি বর্তমানে ভরাটের দ্বার প্রান্তে। দীঘির পুরো অংশ জুড়ে এখন লবণের মাঠ ও মাছের ঘেরের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। মালেকা বানুর মসজিদ ও দীঘিকে পুন:সংস্কার করা না গেলে ইতিহাস থেকে মুছে যাবে মালেকা বানুর স্মৃতি। মলেকা বানুর মসজিদটি অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকলেও বিশাল আকারের দীঘিটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওই দীঘিতে শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ এবং বর্ষা মৌসুমে মাছ চাষ করেন স্থানীয় জনগণ। ইতিহাসের নিদর্শন রক্ষার জন্য মালেকা বানুর মসজিদ ও দীঘি সংরক্ষণ করা জরুরি বলে এলাকাবাসী মনে করেন।


যেভাবে যাবেন: চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল হতে বাঁশখালীগামী স্পেশাল বাস/ সুপার সার্ভিসে বাঁশখালী উপজেলার মিয়ার বাজার স্টেশনে নেমে প্রধানসড়কস্থ পশ্চিম দিকে হারুনবাজার সড়ক দিয়ে সিএনজি অটোটেক্সি, মাইক্রোবাসে সরাসরি সরল বাজার যেতে হবে। সরল বাজার থেকে সামান্য দূরে পশ্চিম দিকে একই গাড়ী নিয়ে মালেকা বানুর স্মৃতিবিজড়িত দীঘি ও মসজিদ স্পটে যাওয়া যাবে।
 


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162