রবিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ | ১, পৌষ, ১৪২৫
 / শেয়ার বাজার ও বাণিজ্য / ফারমার্সের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কিনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মতি
মাসুদ শায়ান, ডেসটিনি অনলাইন :
Published : Tuesday, 8 May, 2018 at 10:08 PM, Count : 306
ফারমার্সের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কিনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মতি

ফারমার্সের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কিনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মতি

অর্থ লোপাট, ঋন জালিয়াতি, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বিপর্যস্ত বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার কেনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোকে ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১’-এর ১৪ক এবং ২৬ক ধারার বিধান পরিপালন থেকে সাধারণভাবে অব্যাহতি দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের অর্থায়নে ঝুঁকিঁপূর্ণ শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বড় বাধা দূর হলো।

মঙ্গলবার (০৮ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর ফলে ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ওই চার ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) আর কোনো বাধা থাকল না। গভর্নর ফজলে কবির স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ এর ১৪নং আইন) এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশে কার্যরত সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, জনতা ব্যাংক লিমিটেড, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড ও রূপালী ব্যাংক লিমিটেডকে দি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের শেয়ার ক্রয় ও ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক এবং ২৬ক ধারার বিধান পরিপালন থেকে সাধারণভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। এতে আরও বলা হয়, এছাড়াও একই আইনের ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, জনতা ব্যাংক লিমিটেড, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ এর পক্ষে তাদের সিইও/ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের পর্ষদে প্রতিনিধি পরিচালক নিযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ২৩ (১)(ক) ধারার বিধান পরিপালন থেকে সাধারণভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। আরেক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সালের ১৪নং আইন) এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এতদ্বারা বাংলাদেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংককে সাবসিডিয়ারি গঠন ব্যতিরেকে ‘সিকিউরিটি কাস্টডিয়াল সেবা’ প্রদানের লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ৭(৩) ধারা পরিপালন থেকে সাধারণভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। এই অব্যাহতি ২২ জুলাই ২০১৮ তারিখ হইতে কার্যকর হবে।

গত কয়েক মাস ধরেই অর্থ সংকটে ডুবতে বসা ফারমার্স ব্যাংককে রক্ষার জন্য বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর একটি হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইসিবি থেকে ফারমার্সকে অর্থ দেয়া। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো এর বিনিময়ে ফারমার্সের শেয়ার চেয়েছিল। এখন এক্ষেত্রে আইনি বাধা কেটে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার কিনতে পারবে; ডুবন্ত ফারমার্সও রক্ষা পাবে। ফারমার্স ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে যারা আছেন, তারা সরকারের কাছ থেকে টাকা চান ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে শেয়ারের মালিকানা দিতে চান না।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ফারমার্স ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশ বিক্রি করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হবে। এসব শেয়ার সরকারি ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিনে নেবে। তিনি বলেন, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে আইনের মুখোমুখি করা হবে। আমরা কোনো ব্যাংককেই মরে যেতে দেব না। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আগামী ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। আলোচনায় অংশ নেয় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই), ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি) এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আলোচনায় ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। আসলে ব্যাংক কলাপসটা জাতীয় ইস্যু হয়ে যায়। ব্যাংক কলাপসের অভিজ্ঞতাও আমাদের খুবই কম। এর আগে বাংলাদেশের ১৯৮৪ সালে ব্যাংক কলাপসের ঘটনা ঘটে। তখন আমিও কিছু টাকা খুয়েছিলাম। অনেক ইন্ডাস্ট্রি সমস্যায় পড়ে। তাই তো আমরাই রুগ্ন শিল্প পলিসি করেছি। অনেক প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়েছি। তারপরও অনেকগুলো মরেছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে এত হইচই হয়নি। কিন্তু ব্যাংকটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাই নতুন করে আর কোনো ব্যাংককে মরে যেতে দেয়া হবে না। অর্থমন্ত্রী বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ টাকা চায়। কিন্তু অধিকাংশ শেয়ার তাদের নামেই রাখতে চাই। কিন্তু আমরা মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশ বিক্রি করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করব। তবে এক্ষেত্রে সরকার কোনো টাকা দিচ্ছে না। সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসব শেয়ার কিনবে। যারা এ ব্যাংকটিকে ধ্বংস করল তাদের কোনো শাস্তি হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। এর আগে এক বিবৃতিতে ব্যাংকটির আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার আহবান জানিয়েছে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। গণমাধ্যম সূত্র উল্লেখ করে বিবৃতিতে তিনি বলেন, অনিয়ম-জালিয়াতির মাধ্যমে আমানতের ঊর্ধ্বে ঋণ প্রদানসহ ব্যাপক অব্যবস্থার কারণে ফারমার্স ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের অর্ধেকেরও বেশি ফেরত আসবে না মর্মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক আশঙ্কার প্রেক্ষিতে আমানতকারীগণ প্রাপ্য অর্থ আদৌ ফেরত পাবেন কিনা, কিংবা পেলেও কবে নাগাদ পাবেন-তা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা এবং পাশাপাশি পুরো ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ‘দুর্নীতি ও জালিয়াতির’ কারণে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং এ দায় থেকে ফারমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষ (সাবেক শীর্ষব্যক্তিসহ) এড়াতে পারে না বলে এতে বলা হয়। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দিন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চিশতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ফারমার্স ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়। অনিয়ম ও জালিয়াতিনির্ভর ঋণ মঞ্জুরে তাদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে চিহ্নিত হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে অযোগ্য ও অসাধু ব্যক্তিদের ঋণ বিতরণের মাধ্যমে কমিশন ভোগ করে ব্যাংকটির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের একাংশ কর্তৃক নৈতিক স্থলনের নির্লজ্জ ও গর্হিত দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। ঋণ জালিয়াতিসহ অন্যান্য অনিয়মের সাথে জড়িতদের জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানানো হয় এ বিবৃতিতে। গ্রাহকদের আমানতের অর্থ আত্মসাৎ করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করার পরও অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকবেন, আর অন্যদিকে আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে গ্রাহকরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে থাকবেন-তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ফারমার্স ব্যাংকের ব্যর্থতায় পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করে টিআইবি। এতে করে ব্যাংকে আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত বোধ করার পাশাপাশি অনেক গ্রাহকের মধ্যে আমানতের অর্থ দ্রুত উত্তোলনের প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করছে বেসরকারি এ সংস্থাটির। এই অবস্থায় সরকারিভাবে নতুন করে মূলধন জোগানোর ব্যবস্থা না করে সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। যাত্রার তিন বছরেই ধুঁকতে থাকা ফারমার্স ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়মের জন্য ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতাদের দায়ী করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চাপের মুখে সম্প্রতি ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে হয় ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সমস্য মহীউদ্দিন খান আলমগীরকে। তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন আসছেন। ২০১৬ সালে শত শত কোটি টাকা অনিয়ম দেখে ফারমার্স ব্যাংকে পর্যবেক্ষক দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটি চার বছর পেরিয়ে এখনো গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও ৫০৮ কোটি টাকা ব্যাংকটিতে আটকে পড়েছে। তারল্য সংকটে পড়ে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩০০ কোটি টাকা আমানত চেয়ে কোনো সাড়া পায়নি ব্যাংকটি। কিন্তু এখন নতুন করে সরকার ৭১৫ কোটি টাকা ঢালার উদ্যোগ নিয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে।


দৈনিক ডেসটিনি’র অনলাইনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


প্রকাশক ও সম্পাদক : মোহাম্মদ রফিকুল আমীন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মিয়া বাবর হোসেন।
© ২০০৬-২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডেসটিনি.কম
আলী’স সেন্টার, ৪০ বিজয়নগর ঢাকা-১০০০।
বিজ্ঞাপন : ০১৫৩৬১৭০০২৪, ৭১৭০২৮০
email: ddaddtoday@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.dainik-destiny.com
ই-মেইল : destinyout@yahoo.com, অনলাইন নিউজ : destinyonline24@gmail.com
Destiny Online : +8801719 472 162